কৌশিক দে, মালদা
সাতসকালে খেতের কাজে যাননি মাধব মণ্ডল, ফিরোজ শেখ। কোদাল, বেলচা ঘাড়ে তাঁরা সটান চলে এসেছেন স্থানীয় বিএসএফের ক্যাম্পে। কোম্পানি কম্যান্ডারকে ডেকে হাসিমুখে বলেছেন, ‘ও সাহেব, শুনলাম আপনারা বাঙ্কার তৈরি করছেন। কোনও লেবার-টেবার দরকার নেই। এই আমরাই হাজির।’ ‘সাহেব’ও বড় মোলায়েম গলায় বললেন, ‘ঠিক হ্যায়, চলিয়ে।’
বৃহস্পতিবার সকালে সীমান্তে গিয়ে দেখা গেল, মাধব, ফিরোজের মতো অন্তত শ’খানেক চাষি হাজির। সকলেই এসেছেন বিএসএফের বাঙ্কার তৈরির কাজে হাত লাগাতে। দুপুর পর্যন্ত চলল কাজ। মালদার বৈষ্ণবনগর থানার সুকদেবপুর সীমান্তে তৈরি হলো গোটা পাঁচেক বাঙ্কার। কাজ শেষে কোম্পানি কম্যান্ডার ‘ধন্যবাদ’ বলতেই হইহই করে উঠেছেন ওঁরা, ‘কী যে বলেন কর্তা! ধন্যবাদ কেন? এ আমাদের দেশের প্রশ্ন। দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন। যে কোনও দরকারে শুধু একটা হাঁক দেবেন। চোখের পলকে আমরা হাজির হয়ে যাব।’
অথচ মাসখানেক আগেও গ্রামবাসী-বিএসএফের সম্পর্কটা ছিল অন্যরকম। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগে তপ্ত থাকত সীমান্তের হাওয়া। বিএসএফের প্রশ্নবাণে জেরবার হতেন বাসিন্দারা। আবার বিএসএফের তরফে বলা হতো, ‘আন্তর্জাতিক সীমান্ত। নিয়ম তো মানতেই হবে।’ দু’-তরফের বরফ গলাতে হস্তক্ষেপ করতেন বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। আয়োজন করা হতো প্রীতি ফুটবল কিংবা ভলিবল ম্যাচের। সীমান্তের ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দেওয়া হতো ফুটবল, ক্রিকেট ব্যাট কিংবা ব্যাডমিন্টনের র্যাকেট। তবে এত দিনের সীমান্তনামচা বদলে দিয়েছে অশান্ত বাংলাদেশ।
কয়েকদিন ধরে সুকদেবপুর সীমান্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে। গত মঙ্গলবার দুপুরে তা চরম আকার নেয়। অভিযোগ, ভারতীয় ভূখণ্ডে কাঁটাতার দেওয়ার কাজে বাধা দিচ্ছিল বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) ও জনাকয়েক বাংলাদেশি নাগরিক। ক্ষিপ্ত হয়ে সীমান্তে ভিড় করেন স্থানীয় গ্রামবাসীরা। তাঁদের কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে রড, আবার কারও হাতে ছিল কাস্তে। ‘বন্দেমাতরম’ ও ‘ভারতমাতা কি জয়’ বলে তাঁদের স্লোগান দিতেও শোনা গিয়েছিল। পরে অবশ্য তাঁদের শান্ত করে বিএসএফ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সুকদেবপুর সীমান্তে নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন বিএসএফের ১১৫ নম্বর ব্যাটেলিয়নের জওয়ানেরা। ওই সীমান্তে কিছুটা এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া বসেছে। আরও পঞ্চাশ মিটার এলাকা কাঁটাতার দিয়ে ঘেরার কাজ চলছে। সেই কাজেই বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গ্রামবাসী মাধব মণ্ডল, অজয় মণ্ডল, নৃপেন হালদার, ফিরোজ শেখরা সমস্বরে বলছেন, ‘বিএসএফের সঙ্গে একটা সময়ে নানা বিষয়ে মন-কষাকষি হয়েছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা। সারাটা বছর বিএসএফ আমাদের রক্ষা করে। এখন ওদের পাশে আমরা না দাঁড়ালে কে দাঁড়াবে?’
বৈষ্ণবনগরের বিধায়ক চন্দনা সরকার বলছেন, ‘বিজিবি ও বাংলাদেশের কিছু নাগরিক বিএসএফের কাজে বাধা দিচ্ছে বলে শুনেছি। ওদের বাধায় কাজ বন্ধ থাকবে, সেটা মানবো না। বিএসএফ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। গ্রামবাসীরাও বিএসএফকে নানা ভাবে সহযোগিতা করছে।’
বিএসএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, সুকদেবপুর সীমান্তে একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিজিবি-র সঙ্গে ‘পতাকা বৈঠক’ করেই সমস্যার সমাধান করা হবে। ১১৫ নম্বর ব্যাটেলিয়নের এক আধিকারিক বলছেন, ‘গ্রামের মানুষ সব সময়ে আমাদের সহযোগিতা করছেন। সম্পর্ক তো এমনটাই হওয়া উচিত।’ মালদার জেলাশাসক নীতিন সিংহানিয়া জানিয়েছেন, সুকদেবপুর সীমান্তের পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক।