জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মুখ্যমন্ত্রী শুভেচ্ছা জানালেন জগদ্বিখ্যাত এক মনীষীকে। সেই মনীষী আবার শুভেচ্ছাপ্রেরকেরই প্রভূত প্রশংসা করে তাঁকে লিখলেন ফিরতি চিঠি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। সম্প্রতি ঘোষণা হয়েছে, হিউম্যানিটিজ় ও সোশ্যাল সায়েন্সে ২০২৫ সালের সর্বোচ্চ সম্মান পেতে চলেছেন গায়ত্রী। নরওয়ের হলবার্গ পুরস্কার। আর্টস ও হিউম্যানিটিজ়ের 'নোবেল' বলে পরিচিত এই পুরস্কার। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী গায়ত্রী স্পিভাকের এই সম্মানে রীতিমতো গর্বিত ও উচ্ছ্বসিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোশ্যাল মিডিায় একটি পোস্ট করে গায়ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান তিনি।
শুভেচ্ছাবার্তায় মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, ''আন্তর্জাতিক স্তরে এই সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়ার জন্য আমি অধ্যাপক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে শুভেচ্ছা জানাই। তিনি চলতি বছরের নরওয়ের হলবার্গ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। এই পুরস্কার আর্টস ও হিউম্যানিটিজ়ের সর্বোচ্চ সম্মান 'নোবেল' বলে পরিচিত। তাঁর এই সম্মান আমাদেরও গর্বিত করেছে।''
মুখ্যমন্ত্রী আরও লেখেন, ''তত্ত্ব ও দর্শনে অনবদ্য অবদানের জন্য সুপরিচিত অধ্যাপিকা গায়ত্রী। বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে গরিব মানুষদের নিয়ে তাঁর ভলান্টিয়ার সার্ভিস আমাকে মুগ্ধ করেছে। এছাড়া অধ্যাপক গায়ত্রীর ধ্রুপদী বাংলা সাহিত্যকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার প্রচেষ্টা আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়। এই গ্রেট স্কলারকে আরও একবার শুভেচ্ছা জানাই।''
মুখ্যমন্ত্রী যোগ করেন, "আর এক বড় সম্মান পেয়ে আমাদের গর্বিত করলেন তিনি । অধ্যাপক স্পিভাক সাহিত্যতত্ত্ব এবং দর্শনে তাঁর অবদানের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। তবে পশ্চিমবঙ্গের কিছু প্রত্যন্ত গ্রামে দরিদ্র মানুষের জন্য তাঁর স্বেচ্ছাসেবা আমাকে মুগ্ধ করেছে । বাংলা সাহিত্যের সেরা ধ্রুপদী রচনাগুলির ইংরেজি অনুবাদ করার তাঁর প্রচেষ্টা আমাদের অনুপ্রাণিত করে।"
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বার্তার প্রতিক্রিয়ায় নিউইয়র্ক থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি লিখলেন অধ্যাপক স্পিভাকও। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর ধর্মনিরপেক্ষতায় তাঁর সমর্থন আছে বলেও জানালেন স্পিভাক।
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক লেখেন, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সমাজে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করায় তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত। স্পিভাক আরও জানান, গত চার দশক ধরে বাংলার অনগ্রসর জেলাগুলিতে দরিদ্র মানুষের গণতান্ত্রিক শিক্ষার প্রসারে তিনি নিবেদিত। মুখ্যমন্ত্রী যে তাঁর এই প্রচেষ্টাকে সম্মান জানিয়েছেন, তা তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপকের কথায়, "গত চল্লিশ বছর ধরে বাংলার বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া জেলার অত্যন্ত দরিদ্রদের গণতান্ত্রিক শিক্ষার প্রতি আমার প্রতিশ্রুতিতে আমি আচ্ছন্ন । আমি তাঁদের সঙ্গে প্রচুর সময় কাটাই । আমি আপনাকে বলতে চাই যে, তাঁরাও আমার এই পুরষ্কার প্রাপ্তিতে অত্যন্ত আনন্দিত । আমি আশা করি, আপনি আমাদের প্রিয় বাংলায় বৌদ্ধিক শ্রমের দিগন্ত প্রসারিত করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টার উপর সদয় নজর রাখবেন।"
স্পিভাক আরও লিখেছেন, "আমি আনন্দিত যে, আপনি এক হাজার বছরের বাংলা লেখার দ্বিভাষিক সংস্করণের আমাদের যে প্রকল্প, তার কথা উল্লেখ করেছেন । বিশ্বের সেরা কিছু লেখক এই লেখার বিশ্বব্যাপী পাঠকদের জন্য বাংলা ক্লাসিকগুলি অনুবাদ করছেন। আমরা দক্ষিণ এশীয় শিল্পীদের কাছ থেকে একটি তহবিল সংগ্রহের নৈশভোজ থেকে এবং বিভিন্ন জন-উদ্দীপক দাতাদের কাছ থেকে অর্থসাহায্য পেয়েছি । আপনার অনুমোদন নিঃসন্দেহে আমাদের তহবিল সংগ্রহে অনেক সাহায্য করবে।" চিঠিটির শেষে অধ্যাপক জানান, ভারত ও বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তিত এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তাঁর সমর্থন রয়েছে। একইসঙ্গে, তাঁর পুরস্কার সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রীর আন্তরিক বার্তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও করেন।
প্রসঙ্গত, তুলনামূলক সাহিত্য, নিম্নবর্গের ইতিহাস, নারীবাদ, সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব ও দর্শন নিয়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা এবং অধ্যাপনা করে আসছেন গায়ত্রী। দেখেতে গেলে এরই স্বীকৃতি হিসেবে নরওয়ের হলবার্গ পুরস্কার অর্থাৎ আর্টস ও হিউম্যানিটিজ়ের নোবেল পাচ্ছেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। তিনি বর্তমানে আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এর আগেও অসংখ্য স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছেন তিনি। নিম্নবর্গ ও প্রান্তিক মানুষ, বিশেষত প্রান্তিক মহিলাদের জন্যেও তাঁর কাজ বিশেষ ভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। স্পিভাক একজন বিশিষ্ট সাহিত্যতাত্ত্বিক, দার্শনিক ও অনুবাদকও। সাহিত্যের জগতে তাঁর অসামান্য অবদান বহু আগেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে । সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন তিনি । দীর্ঘদিন ধরে তিনি পশ্চিমবঙ্গের কিছু প্রত্যন্ত গ্রামে দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার জন্য কাজ করে আসছেন। তাঁর উদ্যোগে গ্রামীণ শিক্ষার প্রসার ঘটেছে ও বহু পিছিয়ে-পড়া শিশু শিক্ষার আলো দেখতে পেরেছে।
আগামী ৫ জুন নরওয়ের বেরজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের হাতে সে দেশের যুবরাজ হাকোন এই পুরস্কার তুলে দেবেন। ভারতীয় মুদ্রায় পুরস্কারের অর্থমূল্য প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা!