টানা নাইট শিফটে ক্লান্ত সেই তরুণী ডাক্তার মনোবিদকে কী বলেছিলেন? বিস্ফোরক তথ্য
আজ তক | ২৬ মার্চ ২০২৫
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ধর্ষণ ও হত্যার শিকার চিকিৎসক মৃত্যুর মাত্র এক মাস আগে প্রবল মানসিক চাপে সাহায্য চেয়েছিলেন। উত্তর ২৪ পরগনার এক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলরের কাছে গিয়ে জানিয়েছিলেন, কাজের চাপে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ছে, অথচ ঘুমোনোরও উপায় নেই।
চোখ জড়িয়ে এলেও ঘুম নেই
গত বছরের জুলাই মাসে ওই কাউন্সিলরের চেম্বারে গিয়ে নির্যাতিতা বলেছিলেন, টানা কাজের ধকল আর অনিদ্রার কারণে তিনি মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছেন। ঘুমের ওষুধও তেমন কাজ করছে না। কাউন্সিলর তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘‘আপনার কি ঘুম আসছে না, নাকি ঘুমোনোর সুযোগই পাচ্ছেন না?’’ জবাবে ওই চিকিৎসক-পড়ুয়া বলেছিলেন, ‘‘দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলেও ঘুমোনোর উপায় নেই। শিফট এমন ভাবে বরাদ্দ করা হয়েছে যে ঘুমানোর জন্য পর্যাপ্ত সময়ই পাচ্ছি না।’’
কাউন্সিলর জানতে চান, এই পরিস্থিতি কি সকলের সঙ্গেই হচ্ছে, নাকি শুধু তাঁর ক্ষেত্রেই? নির্যাতিতা জানান, তাঁর মনে হচ্ছে কর্তৃপক্ষের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাঁকে অতিরিক্ত ডিউটি দেওয়া হচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে তাঁর ওপর আরও বড় শাস্তি নেমে আসতে পারে।
মানসিক অস্থিরতায় সাহায্য চেয়েছিলেন
সোমবার এক সংবাদমাধ্যমের কাছে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত রণদীপ জানান, মৃত্যুর মাত্র এক মাস আগে ওই চিকিৎসক তাঁর কাছেও এসেছিলেন। রণদীপ বলেন, ‘‘তিনি আমাকে জানিয়ে ছিলেন যে টানা ৩৬ ঘণ্টা ডিউটি করতে হচ্ছে। শিফট বরাদ্দেও বৈষম্য হচ্ছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনায় অনিয়মের কথাও বলেছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রবল মানসিক চাপে ভুগছিলেন।’’
রোগীর অবস্থা দেখে রণদীপ তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং পরে আরও একবার আসতে বলেছিলেন। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালের অনিয়মের প্রতিবাদে হয়রানি
নির্যাতিতার পরিবার এবং সহকর্মীদের একাংশ আগেই অভিযোগ করেছিলেন, হাসপাতালের আর্থিক অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ওই চিকিৎসককে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। অভিযোগ, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনায় দুর্নীতি নিয়ে তিনি মুখ খোলায় তাঁকে নানা ভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছিল।
গ্রেফতার অধ্যক্ষ, তদন্তে সিবিআই
ঘটনার পর আরজি কর হাসপাতালের অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে প্রথমে কলকাতা পুলিশ নাগরিক স্বেচ্ছাসেবক সঞ্জয় রায়কে গ্রেফতার করে। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই তদন্তের ভার নেয় এবং সঞ্জয়কেই মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করে।
রাজনৈতিক চাপানউতোর
এই ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও চাপানউতোর অব্যাহত। শাসক তৃণমূল কংগ্রেস বারবার দাবি করেছে, তারা নিরপেক্ষ তদন্ত চায় এবং সিবিআইয়ের ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। যদিও বিরোধীদের অভিযোগ, এই ঘটনায় তৃণমূল সরকার এবং স্বাস্থ্য পরিষেবাকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা চলছে।
হাইকোর্টের নির্দেশ
সোমবার কলকাতা হাইকোর্ট সিবিআইকে নির্দেশ দেয়, ধর্ষণ-হত্যা মামলার তদন্ত সংক্রান্ত কেস ডায়েরি পরবর্তী শুনানির তারিখে আদালতে জমা দিতে হবে। বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, তদন্তে গণধর্ষণ বা প্রমাণ নষ্টের কোনও সম্ভাবনা সিবিআই বিবেচনা করছে কি না।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৯ আগাস্ট উত্তর কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের সেমিনার হল থেকে ওই চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হয়। ঘটনার পর থেকেই রাজ্য জুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। এখন গোটা রাজ্য অপেক্ষায়, ন্যায়বিচার আদৌ মিলবে কি না।