• দুই সন্তানকে নিয়ে ভাগীরথীতে ঝাঁপ, বধূকে উদ্ধার করে মানবধর্মের পাঠ আসাদুলদের
    বর্তমান | ৩০ মার্চ ২০২৫
  • অভিষেক পাল, বহরমপুর: সব ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবধর্ম—ঈদের ঠিক প্রাক মুহূর্তে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার কুমারপুর ঘাটে পাঠ দিল আসাদুলরা।

    নিত্য সাংসারিক অশান্তি। দুই সন্তানের হাত ধরে ভাগীরথীতে মরণঝাঁপ দিয়েছিলেন মামনি মণ্ডল নামে এক বধূ। নৌকায় সওয়ারি ছিলেন। সেটি মাঝ নদীতে যেতেই মামনি এই কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন। যাত্রীরা চিৎকার জুড়ে দেন। কিন্তু কেউই তাদের বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার দুঃসাহস দেখাননি। উল্টোদিকের ঘাটে তখন নৌকা ধরবেন বলে অপেক্ষা করছিলেন আসাদুল শেখ ও কুদ্দুস শেখ। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ভাগীরথীর খরস্রোতে ঝাঁপ দেন দু’জনেই। দ্রুত সাঁতরে চলে আসেন মাঝ নদীতে। যেখানে মামনি পুত্রসন্তানের হাত ধরে একবার ডুবছেন, একবার ভেসে উঠছেন। অন্য হাত থেকে ফস্কে গিয়েছে কন্যাসন্তানটি। জলের তোড়ে তলিয়ে গিয়েছে সে। আসাদুলরা কোনওরকমে মামনি ও তাঁর এক সন্তানকে ডাঙায় তুলে আনেন। কন্যাসন্তানটি নিখোঁজ। হদিশ পেতে তল্লাশি শুরু করেছে বেলডাঙার পুলিস। নামানো হয়েছে ডুবুরিদেরও। শনিবার রাত পর্যন্ত তার কোনও খোঁজ মেলেনি। 

    মুহূর্তেই আসাদুলদের এই সাহসিকতার কাহিনি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে গোটা জেলাতেই। সোশ্যাল মিডিয়াতেও ভাইরাল। আসাদুলদের বাহবা দিয়েছেন জেলার পুলিসকর্তারাও। 

    শক্তিপুরের কামনগরে বাড়ি মামনির। শনিবার দুপুরে সাটুইয়ের ঘাট থেকে নৌকায় ওঠেন তিনি। সঙ্গে সাত বছরের এক কন্যাসন্তান ও তিন বছরের এক পুত্রসন্তান। নৌকার যাত্রী গৌরাঙ্গ দাসের কথায়, ‘ওরা তিনজন নৌকার একদিকে বসে ছিল। মাঝ নদীতে নৌকা আসতেই ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঝাঁপ দেন ওই মহিলা। আমরা নৌকা থেকেই উদ্ধারের চেষ্টা করি। কিন্তু স্রোতের টানে নৌকা অনেকটা চলে গিয়েছিল। ঘোরানো যায়নি। উল্টোদিকের কুমারপুর ঘাট থেকে দুই যুবক দ্রুত সাঁতরে ওদের কাছে চলে আসে।’ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেও অঝোরে কেঁদে চলেছেন মামনি। মেয়েকে হারিয়ে বিলাপ করছেন অনবরত। আর বলছেন, ‘কেন আমাদের বাঁচালে? আমার জীবনটা ওরা এমনিতেই তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিল। শ্বশুর-শাশুড়ির নিত্য অকথ্য অত্যাচার আর সহ্য করতে পারছিলাম না।’ আসাদুল বলছিলেন, ‘চোখের সামনে একজন মহিলা ও তাঁর দুই সন্তান তলিয়ে যাবে, তা মেনে নিতে পারিনি। মোবাইল ও মানিব্যাগটা ডাঙায় ফেলে ঝাঁপ দিই। আমার দেখা দেখি আর এক যুবকও ঝাঁপ দেন। পরে ওঁর নাম-পরিচয় জেনেছি। ও খুব সাহায্য করেছে। আমি বাচ্চাটাকে ডিঙিতে তুলে দিয়েই ওই মহিলাকে ডাঙায় নিয়ে আসি। মেয়েটিকে উদ্ধার করতে না পারার যন্ত্রণা কুরে কুরে খাচ্ছে।’
  • Link to this news (বর্তমান)