• অক্সফোর্ডে প্রতিবাদ করলেন কারা? বুড়ো আঙুলের বিপ্লব থেকে লাভের গুড় খেল কে
    হিন্দুস্তান টাইমস | ৩০ মার্চ ২০২৫
  • নেটফ্লিক্সের ‘অ্যাডোলেসেন্স’ নামক সিরিজটি কত জন দেখেছেন? যত জন দেখেছেন, তার চেয়েও বেশি মানুষ এর ব্যাখ্যা জেনে গিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে। বাপ-মায়ের সময় না পাওয়া, নিজের চেহারা নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগা, অপর লিঙ্গের সান্নিধ্যকামী এক বয়ঃসন্ধির কিশোর। ‘বহু কিছু নেই’-মার্কা এক ধরনের হতাশা থেকেই একদিন সেই ‘নাদান’ ঘটিয়ে ফেলে একটি অপরাধ।

    সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এই কাহিনি বঙ্গ জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। তার প্রধান কারণ, কে না জানেন, বাঙালি মাত্রই শখের মনোবিদ। বিলেতের এক বয়ঃসন্ধির কিশোরের আর্থসামাজিক অবস্থানের সঙ্গে বাঙালি এক ব্র্যাকেটে বসতে পারে না বটে, কিন্তু সেই কিশোর-মনের ব্যবচ্ছেদ করার সময় সুনিপুণ বাঙালির কিবোর্ডে হাত কাঁপে না। বাঙালি এতটাই ‘ডাক্তার’!

    নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে একটা কথা ছেলেছোকরা মহলে বেশ পরিচিত ছিল। ‘যৌবনের গাদ’। সমুদ্রের জল রঙের নীল কেরোসিনের তলায় পড়ে থাকা কাদা-কাদা ময়লা। যৌবনের কেরোসিনটা যখন তীব্র ভাবে জ্বলত, তখন তা থেকেই জন্ম নিত কবিতা, ক্যানভাসের গায়ে আঁচড়, বা শুধু খ্যাপা চিৎকার। কারও কারও ক্ষেত্রে পথে নামা রাজনীতি। যে রাজনীতিকে শাসক দল কখনও পছন্দ করত, কখনও অপছন্দ। তবে ফিল্মি কায়দায় বলতে গেলে যাকে বলে— উপেক্ষা করতে পারত না। কিন্তু গাদটার কী হত? কেরোসিনের তলায় পড়ে থাকা কাদাটার? যৌবনের সেই অবশ্যম্ভাবী ময়লা নিয়ে বিগত শতাব্দীর শেষের দিকের বাঙালি যুবক কী করতে পেরেছিল? কেউ কেউ কিছুই করেনি। কেরোসিনের ডিব্বায় ময়লা ঘুলে টুলে এক্কেবারে যা তা হয়েছে। কারও কারও ক্ষেত্রে সেই গাদ হজম করতে হয়েছে কাছের মানুষকে। বাবা-মা, প্রেমিক-প্রেমিকা, ভাই-বোন থেকে পোষা বিড়াল হয়ে মায় পোড়া মাটির অ্যাশট্রেও সেই তালিকায়।

    বিলেতের কিশোরের কথা দিয়ে শুরু হয়েছিল। বিলেতের যুবদের কথার দিকে এগোনো যাক। বিলেতের যুবক-যুবতী। কিন্তু আদতে তাঁরা বাঙালি। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে দাদাঠাকুরের চারটে লাইন না বললেই নয়। ‘সানাইধারী কানাই... কেঁচে দিয়ে পাকা ঘুঁটি, চলেছি তায় গুটি গুটি, অসহযোগ সহযোগে পেরেক ঠুকিব। দেশকে বড় ভালবাসি,তাইতে মালসী অভিলাষী, ভোগের মতলব নাই হে শুধু গন্ধ শুঁকিব।’ বর্তমানে বিলেতের বয়ঃসন্ধির কিশোরকে যদি বাঙালি মহলে কেউ বা কারা কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলে থাকেন, তাহলে তাঁরা এই সানাইধারী কানাই-রা।

    এবার একটু ঝেড়ে কাশা যাক।

    সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিলেতে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন। এত ক্ষণে সকলেই জেনে গিয়েছেন, সেখানে একদল প্রতিবাদী হাজির হয়েছিলেন। তাঁরা প্রথমে আরজি কর কাণ্ডের প্রতিবাদ করেন। ‘অভয়া’ নামটি বারবার বলতে থাকেন। পরে ব্যাপারটির সঙ্গে ‘হিন্দুদের জন্য কেউ আছেন’ গোছের প্রশ্ন জুড়ে যায়। মুখ্যমন্ত্রী এর জবাবে কী করেন? হাতের ইশারায় একটি ছবি বার করার নির্দেশ দেন। বেরিয়ে আসে তিন দশক পুরনো একটি ছবি। হাতে ব্যান্ডেজ, মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে তিনি বিছানায় শুয়ে। এর পরে তিনি প্রতিবাদীদের উদ্দেশে বলতে থাকেন এমন কিছু কথা, যার সঙ্গে আপাতভাবে রাজনীতির সম্পর্ক নেই। ‘বাবা-বাছা, পরের বার তোমাদের জন্য চকোলেট আনব। ওরা এরকম দুষ্টু’ —এই জাতীয় কিছু।

    প্রতিবাদীরা থেমে যান। রাজনৈতিক অস্ত্র যেখানে ধারালো, সেখানেও অরাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন। গদায় যতই ভার থাকুক না কেন, সে কি পারবে থান কাপড় কাটতে? কিন্তু থান কাপড় সহজেই পারে গদাকে মুড়ে ফেলতে। বিষয়টি সেখানেই যদি ওই হয়, এখানে তো ধারে ভারে গদার বদলে চিমটি।

    যাই হোক, এবার প্রশ্ন এই প্রতিবাদীরা কারা? এ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা এখনও পর্যন্ত পাওয়া না গেলেও, ভারতের বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের তরফে দাবি করা হয়েছে, ‘ওরা আমাদের লোক’। তেমনই এক রাজনৈতিক নেতা দাবি করেছেন, ‘ওরা বাঙালি হিন্দু’ । অবশ্য এই দুই ‘আমাদের’ মধ্যে বিরোধ নাও থাকতে পারে। ব্যাপারটা এখানে শেষ হলে ভালো হত। হল না।

    যে বাঙালি শখের মনোবিদরা এর আগে বয়ঃসন্ধির সমস্যা নিয়ে ভাবছিলেন, এবার তাঁরা নেমে পড়েছেন অন্য দু’টি থিয়োরি নিয়ে।

    থিয়োরি ১: উনি নিজেই পুরোটা ঘটিয়েছেন। আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন। সেই মতো হয়েছে।

    থিয়োরি ২: উনি আগে থেকেই জানতেন, এটা হবে। তাই ব্যাগে করে তিন দশক আগের ছবিটা নিয়ে ঘুরছিলেন।

    এর সঙ্গে লেজুড়ের মতো একটা থিয়োরি ২-এর ক’ও আছে। সেটা হল— উনি জানতেন না এরকম কিছু হবে। কিন্তু এমন ধুরন্ধর মানুষ যে, তিন দশক আগের ছবিটা সঙ্গে নিয়ে সব সময়ে ঘুরে বেড়ান।

    থিয়োরি দুই বা আড়াই, যাই হোক না কেন, এই সব বাঙালি ‘মনোবিদ’ বা সমাজতাত্ত্বিকদের সকলেই একমত, গোটা ঘটনায় লাভ একজনেরই হয়েছে।

    এই মওকায় একটু ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। তিরিশের দশক। স্পেনে গৃহযুদ্ধ সপ্তমে। ক্ষমতায় বামপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত সরকার। নানা প্রান্তে মাথাচাড়া দিয়েছে একের পর এক ডানপন্থী এবং রক্ষণশীল গোষ্ঠী। বামপন্থীদের সরকার টলোমলো। দেশের সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে, দক্ষিণপন্থী এবং রক্ষণশীল গোষ্ঠীদের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন ফ্রাঙ্কো। শোনা যায়, বামপন্থীদের কিছু শাখাও নাকি তাঁকে সমর্থন করে। কারণ ফ্রাঙ্কো নাকি স্থিতিশীল স্পেনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। স্পেন স্থিতিশীল হল বটে। তবে কিয়ৎকালের জন্য। ক্ষমতায় টিকে থাকতে এর পর ফ্রাঙ্কো নাকি বার বার আশ্রয় নেন নাটুকে প্রতিবাদের। একই কথা বলা যায়, চিলের অগুস্তো পিনোশে সম্পর্কেও। প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দেকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেশের প্রধান হয়ে বসেন পিনোশে। এর পরে নাকি ক্ষমতায় টিকে থাকতে বার বার বামপন্থী ‘জুজু’ দেখানোর আশ্রয় নিতেন তিনি। সেই সব ‘বামপন্থীরা’ প্রতিবাদ করতেন। পিনোশে হাসতে হাসতে তাঁদের সামলাতেন। জয়ের শেষে বলতেন, বিদেশি টাকায় মদতপুষ্ট বামপন্থীদের থেকে সবাইকে, দেশকে রক্ষা করলেন।

    ইতিহাসে এমন উদাহরণ নেহাত কম নয়। ক্ষমতায় টিকে থাকতে অরকেসট্রেটেড প্রতিবাদ যে পরিচিত অস্ত্র, একথা অনেকেই জানেন। এখানে তেমন কিছু হয়েছে, সে কথাও কেউ জোরের সঙ্গে বলতে পারেন না। থিয়োরি ১ ঠিক, নাকি থিয়োরি ২, নাকি অন্য কোনও থিয়োরি রয়েছে এর পিছনে— তা নিয়েও চর্চার দরকার এখনই নেই। বরং যা নিয়ে চর্চার দরকার, তা হল এর অভিঘাত।

    অক্সফোর্ডে প্রতিবাদ হল। তার জেরে খুশি হলেন বঙ্গদেশের ‘বামপন্থীরা’। প্রয়াত বামনেতা বলেছিলেন, বামফ্রন্টের বিকল্প উন্নততর বামফ্রন্ট। সেই উন্নততর বামফ্রন্টের অবস্থান কি শুধুই সোশ্যাল মিডিয়ায়? এই প্রশ্নের উত্তর আর তাঁর থেকে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু এহেন উন্নততর বামপন্থী এই প্রতিবাদকে নিজেদের নৈতিক জয় হিসাবেই দেখছেন। অবশ্য ‘হিন্দুদের জন্য কেউ আছেন’-এর পয়েন্ট-টা উহ্য রেখেই এই জয় উপভোগ করছেন তাঁরা। লিখছেন প্যারাগ্রাফের পর প্যারাগ্রাফ। ‘শতং বদ মা লিখ’কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই জয় উপভোগে নেমেছেন তাঁরা। যদিও বা তা বিপক্ষের পাইয়ে দেওয়া জয় হয়, তাতেও ক্ষতি কী— এমন মনোভাব নিয়েই বিজিত বিশ্বকাপ রূপে হাতের ফোনটাকে কল্পনা করে সোশ্যাল মিডিয়া সহযোগে বিছানায় নিদ্রা যাচ্ছেন তাঁরা। থিসিস, অ্যান্টিথিসিস, সিনথিসিস পেরিয়ে স্বপ্নের জগতে হয়তো ‘অ্যাবসলিউট স্পিরিট’-এর সন্ধানও পাচ্ছেন। এও হয়তো যৌবনের ওই নীল রঙের কেরোসিন। তীব্র ভাবে জ্বলে উঠছে সুযোগ পেলেই। কিন্তু তার গাদ জমা হচ্ছে কোথায়? এক দুনিয়ার ‘বহু কিছু নেই’-মার্কা হতাশা থেকে অন্য দুনিয়ায় বাক্যের বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলা ‘নাদান’-এর যৌবনের অবশ্যম্ভাবী ময়লা এসে জমা হচ্ছে নখের ডগায়। বুড়ো আঙুলের নখের ডগায়। যা থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় জন্ম নিচ্ছে একের পর এক প্রতিবাদ।

    এর ফল কী হচ্ছে? চিমটি আরও দুর্বল হচ্ছে, নখের আরও ক্ষয় হচ্ছে, শনৈঃ শনৈঃ এই জগতে প্রতিবাদের অস্ত্র টুসকিতে পর্যবসিত হচ্ছে। চিন্তা সেখানেই।

    সুস্থ গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে বিরোধীদের শক্তিশালী হতেই হয়। একথা বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়তে হয় না। চারপাশে তাকাতে হয়। ফোন থেকে চোখ তুলে।

    দাদাঠাকুরের সানাইধারী কানাইয়ের চারটে লাইন আগে লেখা হয়েছে। অতএব, ছড়াটি শেষ করাও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কোনও কিছুর সঙ্গে তার মিল খুঁজতে যাবেন না। ‘আউট ভোটেড হব জানি, করবো তবু টানাটানি, বিকারের রোগীর মতো প্রলাপ বকিব।’
  • Link to this news (হিন্দুস্তান টাইমস)