• রঘুনাথপুরে ভরাট করা হয়েছে বহু জলাশয়, বনদপ্তরের জমি দখল, অভিযুক্ত ইস্পাত কারখানা!
    বর্তমান | ৩১ মার্চ ২০২৫
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: বনদপ্তরের জমি দখলের অভিযোগ উঠল রঘুনাথপুরের একটি ‘নামী’ ইস্পাত কারখানার বিরুদ্ধে। পুরুলিয়া-বরাকর রোডের উপর অবস্থিত ওই কারখানারটির বিরুদ্ধে বনদপ্তরের জমি দখলের অভিযোগ জমা পড়েছে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুন্যাল থেকে শুরু করে বনদপ্তরের পদস্থ আধিকারিকদের কাছেও। তবে বিষয়টি নিয়ে কোনও হেলদোলই নেই বনদপ্তরের। বরং গোটা প্রক্রিয়ায় আধিকারিকদের একাংশের বিরুদ্ধে মদত দেওয়ার অভিযোগ উঠছে।

    প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, রঘুনাথপুর-১ ব্লকের লছমনপুর, দিগারডি, ঝাড়ুখামার, শিকরাট্যাঁড়, সেনেরা সহ বিভিন্ন মৌজার প্রায় কয়েকশো একর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে ওই কারখানা। যদিও তারপরেও বনদপ্তরের জমি দখলের অভিযোগ উঠছে। বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৬৬ সালের ‘ক্যালক্যাটা গেজেট নোটিফিকেশন’ অনুসারে শিকরাট্যাঁড় মৌজার ৭৩৯, ৭৩৬ ও ৬২৫ প্লটগুলি মিলিয়ে প্রায় ৮০ একর জমি রয়েছে বনদপ্তরের। এর মধ্যে ৭৩৯ নম্বর প্লটের প্রায় ২৫ হেক্টর জমিতে ২০০৬ সালে বনসৃজনও করে বনদপ্তর। সেই গাছ এখনও রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ, ২০২২ সালের পর থেকে আশ্চর্যজনকভাবে ওই জমি ক্রমশই দখল করতে থাকে কারখানা কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যেই কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে জঙ্গলের বিস্তীর্ণ এলাকা। ভিতরে তৈরি হয়েছে কংক্রিটের রোড।

    বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, এনিয়ে অভিযোগ পেয়ে রঘুনাথপুর রেঞ্জের তরফে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করা হয়। ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রঘুনাথপুরের রেঞ্জের তরফে সেই তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়ে কংসাবতী উত্তরের ডিএফও-র কাছেও। রিপোর্টে জমি দখলের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। রঘুনাথপুরের রেঞ্জার নীলাদ্রি শাখা মানছেন, ‘তদন্ত করেছিলাম। সেই রিপোর্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জমা দিয়েছি। এর থেকে বেশি কিছু বলতে পারব না।’ যদিও আশ্চর্যজনকভাবে তার পরেই বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। এনিয়ে আর কোনও পদক্ষেপই করতে দেখা যায়নি বনদপ্তরকে। কংসাবতী উত্তরের ডিএফও বিপাশা সুরুল বলেন, ‘এরকম কোনও ব্যাপার নেই। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

    শুধু জমি দখলই নয়, ওই শিকরাট্যাঁড় মৌজাতেই কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বহু পুকুর ভরাটেরও অভিযোগ জমা পড়েছে প্রশাসনের কাছে। কারখানার অদূরেই রয়েছে সেনেরার পাহাড় ও জঙ্গল। বহু বন্যপ্রাণের বসবাস ওই জঙ্গলে। তাদের কাছে পানীয় জলের অন্যতম ভরসা ছিল ওই পুকুরগুলি। কিন্তু, যেভাবে পুকুর ভরাট হয়েছে, আগামী দিনে বন্যপ্রাণের সঙ্গে মানুষের সংঘাত আরও বাড়বে বলেই মনে করছে পরিবেশবিদ এবং পশুপ্রেমী সংগঠনগুলি। বন্যপ্রাণের অকাল মৃত্যুর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, কারখানার দখলে এমন জায়গা রয়েছে, যা ২০২০ নাগাদ বাংলার ভূমি ওয়েবসাইটে ‘জঙ্গল’ হিসেবে রেকর্ড ছিল। কিন্তু কোনও অজ্ঞাতকারণে সেগুলির রেকর্ড বদলে গিয়েছে। যা, ১৯৮০ সালের বনসংরক্ষণ আইনের পরিপন্থী বলে অভিযোগ। গোটা বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন পরিবেশপ্রেমী ও স্থানীয় মানুষজন। এনিয়ে ওই ইস্পাত কারখানার এজিএম(এইচআর অ্যান্ড আইআর)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। যদিও বিষয়টি নিয়ে কিছু বলতে চাননি। 

    বিজেপির জেলা সহ সভাপতি গৌতম রায় বলেন, বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত হলে বহু রাঘব বোয়ালের নাম উঠে আসবে। তৃণমূলের কিছু নেতা, বনদপ্তর ও ভূমিদপ্তরের কিছু আধিকারিক ওই শিল্প সংস্থাকে এসব অবৈধ কারবারে মদত দিচ্ছে। ক্রমশই লুট হয়ে যাচ্ছে জল-জমি-জঙ্গল। তৃণমূল নেতা তথা জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ জয়মল ভট্টাচার্য বলেন, না জেনে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। আমি বনদপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে এবিষয়ে কথা বলব। তাঁর সংযোজন, বিজেপি কী বলল তাতে কিছু যায় আসে না। ওরা রাজনৈতিকভাবে এমনিতেই দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে।
  • Link to this news (বর্তমান)