• উপেন্দ্রকিশোর বা চিত্তরঞ্জন, ১৮৭৬ থেকে বাংলার সব বিয়ের রেজিস্ট্রি এবার ডিজিটাল
    বর্তমান | ৩১ মার্চ ২০২৫
  • বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ১৮৮৫ সালের জুন মাস। বর্ষার প্রথম লগনসায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। পাত্রী, বিধুমুখী গঙ্গোপাধ্যায়। অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে নয়। তাঁরা ঠিক করলেন, একেবারে সইসাবুদ করে আইনে বাঁধা পড়ুক তাঁদের সম্পর্ক। বিয়ের রেজিস্ট্রি হল পুরোদস্তুর নিয়ম মেনে। সাক্ষী হিসেবে নথিতে সই করলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু। ১৫ জুন রেজিষ্ট্রেশন হল উপেন্দ্রকিশোর ও বিধুমুখীদেবীর বিয়ের।

    বাংলার কল্লোল যুগের যত দিকপাল গত দেড়শো বছরের নানা সময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন, তাঁদের বিয়ের রেজিস্ট্রির নথি সংরক্ষিত রয়েছে রাজ্যের আইন দপ্তরে। আর শুধু তাঁরাই কেন? বাংলার প্রত্যেক সাধারণ মানুষের বিয়ের নথি সংরক্ষণ করাই রেওয়াজ প্রশাসনের তরফে। মুশকিল হল, সেসবই কাগুজে নথি। তার ক্ষয় আছে। ১৮৭৬ সাল থেকে বিয়ে সংক্রান্ত কাগুজে নথি সংরক্ষিত আছে রাজ্য সরকারের কাছে। তা কতদিন এভাবে সংরক্ষণ করা যাবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন দপ্তরের কর্তারাই। তাঁদের কথায়, আগামী দিনে বিয়ের নথি পেপারলেস বা কাগজবিহীন হতে চলেছে। কিন্তু যে নথি রয়েছে, তা মূলত কাগজ ও খাতাভিত্তিক। ইতিমধ্যেই নষ্ট হতে শুরু করেছে। তাই তার ডিজিটাল সংরক্ষণ না করলে মুশকিল। দপ্তরের কর্তাদের কথায়, নথিগুলিতে নজর দিলে দেখা যাবে, তাতে ইতিহাসের মণিমানিক্য ছড়ানো। শুধু ১৮ শতক বা ১৯ শতকের গোড়ার দিকে চোখ বোলালেই দেখবেন, বিয়ে অথবা সাক্ষীর তালিকায় সই করেছেন নীলরতন সরকার, কুঞ্জবিহারী সেন, বিপিনচন্দ্র পাল, নরসিংহ দত্ত, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, চিত্তরঞ্জন দাশ, হেমন্ত বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী, শ্রীশচন্দ্র রায় প্রমুখ। সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের দিকপালরা তো রয়েছেনই।

    তাই এবার বিগত দেড়শো বছরের বিয়ের যাবতীয় রেজিষ্ট্রেশন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করছে আইন দপ্তর। সেখানে ঠাঁই পাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের বিয়ের নথি। প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ কাগুজে নথি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হবে এখানে। তার কাজও প্রায় শেষের পথে। দপ্তরের কর্তারা বলছেন, এই কাজটি যে শুধু ইতিহাস বা আইনি দলিলের সংরক্ষণ, তা নয়। এর অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও আছে। যদি কেউ বিয়ের তথ্য গোপন করে দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসেন, তাহলে নিশ্চিতভাবে তিনি ধরা পড়ে যাবেন। কারণ, কাগুজে নথিতে যে তথ্য গোপন করার সুযোগ ছিল, তা এখন এক ক্লিকেই সামনে আসবে। প্রতিটি বিবাহিত মানুষের বিয়ে সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা অনেক সহজ হবে এবার থেকে। তেমনটাই জানাচ্ছেন আইন দপ্তরের কর্তারা। আসন্ন অর্থবর্ষের গোড়ার দিকেই এই পরিষেবা চালু করছে রাজ্য সরকার।

    দপ্তরের কর্তারা বলছেন, শুধু যে কাগুজে নথিগুলির ছবি তুলে ডিজিটাইজড করা হচ্ছে, তা নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিবাহিতদের নাম, বাবার নাম ও অন্যান্য তথ্যও রাখা হচ্ছে। ফলে কেউ চ্যালেঞ্জ করলেই বিয়ে গোপনকারী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় সামনে আসবে। একই নামে একাধিক ব্যক্তি থাকতেই পারেন। কিন্তু বাবার নামও এক হওয়ার সম্ভাবনা বিরল। তাই এই নথিগুলি আইনি সহায়তাও দেবে।
  • Link to this news (বর্তমান)