শুধু জোট গড়েই হবে না। বিজেপি-আরএসএসের দাপুটে রাজনীতির সঙ্গে এঁটে উঠতে গেলে বামপন্থী দলের নিজস্ব শক্তি বাড়ানো জরুরি। সেই লক্ষ্যে জঙ্গি আন্দোলনে পারদর্শী লড়াকু কর্মী বাহিনী গড়ে তোলার পক্ষে সওয়াল করলেন সিপিএমের শীর্ষ নেতা প্রকাশ কারাট।
তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ে আগামী ২ থেকে ৬ এপ্রিল হতে চলেছে সিপিএমের ২৪তম পার্টি কংগ্রেস। তার প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। আরএসএস-বিজেপির ‘হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এবং নব্য উদার আর্থিক নীতি’র সঙ্গে লড়াই করার পথ খোঁজাই এ বারে পার্টি কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে সিপিএমের তরফে। দলের নীতি নির্ধারণের সর্বোচ্চ আসরে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক কৌশলের পর্যালোচনা— এই তিন রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হবে। পার্টি কংগ্রেস শুরুর আগে দলকে শক্তিশালী করা ও আন্দোলনের ধার বাড়ানোর বার্তাই স্পষ্ট করে দিয়েছেন সিপিএমের পলিটব্যুরোর কো-অর্ডিনেটর কারাট।
এক দিকে উৎপাদন ক্ষেত্র-সহ মূল শিল্পের সংগঠিত শ্রমিক এবং অন্য দিকে নানা ধরনের চুক্তি ও ঠিকার আওতায় থাকা অসংগঠিত শ্রমিকদের মধ্যে দলকে আরও বেশি করে প্রসারিত করার কথা বলেছেন কারাট। তাঁর মতে, ‘‘আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রচার এবং দলের রাজনৈতিক মঞ্চে মানুষকে সমবেত করার দিকে অনেক বেশি নজর দিতে হবে। জোট বা নির্বাচনী সমঝোতার নামে আমাদের নিজস্ব পরিচিতি বিসর্জন এবং স্বাধীন কর্মকাণ্ড কমিয়ে ফেললে চলবে না। বিশেষ করে, মতাদর্শগত কাজ এবং আরএসএস-হিন্দুত্ব বাহিনীর মোকাবিলা করে পাল্টা প্রচারে গুরুত্ব দিতে হবে।’’ গোটা দেশে প্রায় ১০ লক্ষ সদস্য থাকলেও সংগঠনের ধার যে কমে গিয়েছে, তা কার্যত স্বীকারই করে নিয়েছেন কারাট।
এই সূত্রেই স্থানীয় স্তরে ধারাবাহিক আন্দোলন, কর্মসূচি করে জনতার সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলার কথা বলেছেন সিপিএমের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক। সামাজিক শোষণ এবং শ্রেণিগত বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করার বার্তা দিয়েছেন। এই ধরনের লড়াই থেকে দলের শ্রেণি সংগঠন ও গণ-সংগঠনে কর্মী তুলে আনার সওয়াল করেছেন তিনি। কারাট বলেছেন, ‘‘দলের নিজস্ব শক্তি বৃদ্ধি পাবে তখনই, যখন লড়াকু, উদ্যমী, আগুয়ান কর্মীবাহিনী, যারা জঙ্গি আন্দোলনে পারদর্শী, তাদের রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত করে দলের দিকে টেনে আনা যাবে।’’ সাম্প্রতিক কালে তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমে স্যামসাং-এর কারখানায় টানা ৩৮ দিনের ধর্মঘট করে কর্মীদের দাবি আদায় বা বিশাখাপত্তনমের ইস্পাত কারখানাকে বেসরকারিকরণের চেষ্টার প্রতিবাদে কর্মী আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনেছেন কারাট। তাঁর বিশ্লেষণে, আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিরে আসার পরে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আরও বেশি করে দক্ষিণপন্থী নীতি ও অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও এই অর্থনীতির বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন জরুরি।
তবে দলের শক্তি বাড়ানোয় নজর দিলেও সঙ্ঘ-বিজেপির মোকাবিলায় বৃহত্তর শক্তির সমন্বয়ের কথাও বলেছেন কারাট। তাঁর বক্তব্য, খেটে খাওয়া মানুষের বিভিন্ন অংশকে সঙ্গে নিয়ে বামেদের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সব শক্তিকে একজোট করতে হবে। যাতে ‘প্রতিক্রিয়ার অন্ধকার শক্তি’র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। সিপিএম সূত্রের মতে, এই ক্ষেত্রে প্রয়াত সীতারাম ইয়েচুরির নেতৃত্বে দল যে পথে চলছিল, এখন কংগ্রেস সম্পর্কে কিছুটা সমালোচনামূলক মনোভাব নিলেও সেই রাস্তা থেকে এ বারের পার্টি কংগ্রেসে কারাটের দলের সরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
রীতি মেনে মাদুরাইয়েও পার্টি কংগ্রেসের উদ্বোধনী দিনে সিপিআই, আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক এবং সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের মতো বামপন্থী দলগুলির সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা, মনোজ ভট্টাচার্য, জি দেবরাজন ও দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পার্টি কংগ্রেস চলাকালীন একটি আলোচনা-সভায় আমন্ত্রিত তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী, ডিএমকে-র এম কে স্ট্যালিন এবং কর্নাটকের কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী কৃষ্ণ বায়ার গৌড়াও।