‘মানুষ’ হবে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের সন্তানরাও, দত্তক দিয়ে ভালো পরিবারে পাঠানোর উদ্যোগ রাজ্যের
বর্তমান | ০২ এপ্রিল ২০২৫
সুকান্ত বসু, কলকাতা: আজাদকে মনে আছে? পাঁচ বছর বয়সে মাকে ফাঁসির দড়ির দিকে এগিয়ে যেতে দেখেছিল সে। বাবা নিখোঁজ। কখনও চোখে দেখেনি। সংশোধনাগারের জেলর কাবেরী কাছে টেনে নিয়েছিলেন তাকে। বড় হয়ে সেই ছোট্ট ছেলেটি হয়েছিল পুলিস অফিসার। এখানেই শেষ নয়, সে রুখে দাঁড়িয়েছিল সিস্টেমের অন্ধকার দিকের বিরুদ্ধে। পালন করেছিল সুনাগরিকের কর্তব্য। দর্শক চিনেছিল তাকে ‘জওয়ান’ হিসেবে। মোক্ষম একটা প্রশ্ন আরও একবার মাথাচাড়া দিয়েছিল সমাজের অন্দরে—সাজাপ্রাপ্ত বন্দির সন্তানের কি কলঙ্কহীন জীবন কাটানোর অধিকার নেই? কেন বাবামায়ের অপরাধের বোঝা তাদের বয়ে বেড়াতে হবে? কেন তারা ভালোভাবে ‘মানুষ’ হওয়ার সুযোগ পাবে না? এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজতে নেমে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নবান্নের সিদ্ধান্ত, এবার সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের সন্তানদেরও ভালো পরিবারের সদস্যরা ‘দত্তক’ নিতে পারবেন। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। কলকাতা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ (লিগ্যাল এইড) ও কলকাতা জেলা চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির (সিডব্লুসি) আধিকারিকরা শহরের দুই সংশোধনাগারে গিয়ে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন লিগ্যাল এইডের সচিব তথা বিচারক মৌ ঘটক মজুমদার ও চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারপার্সন মহুয়া সুর রায়ও। প্রেসিডেন্সির ৭০ জন পুরুষ এবং আলিপুর মহিলা জেলের ৮০ মহিলা বন্দির সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে কথা বলেছেন তাঁরা।
জেল সূত্রে খবর, দুই দপ্তরের আধিকারিকরাই সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের এ ব্যাপারে ভেবে দেখতে বলেছেন। কথা বলতে বলেছেন পরিবারের সঙ্গেও। কারও সন্তান মায়ের সঙ্গে জেলে থাকে, কারও আবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। সেখানেও হয়তো আর্থিক সঙ্কট। বন্দিরা ভাবনাচিন্তা করার পর আবার তাঁরা আসবেন। এক থেকে দেড় মাসের মাথায়। প্রস্তাবে যাঁরা রাজি হবেন, তাঁদের সন্তানদের ‘দত্তক’ হিসেবে ভালো পরিবারে পাঠানোর ক্ষেত্রে যাবতীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেই এগবে সরকার।
এই উদ্যোগের সূত্রপাত কোথায়? মাঝে মাঝেই জেলের সামগ্রিক অবস্থা খতিয়ে দেখতে আসে লিগ্যাল এইড। তখনই অফিসাররা সন্তানদের ব্যাপারে উদ্বেগের কথা শুনেছেন কোনও কোনও সাজাপ্রাপ্ত বন্দির থেকে। জানতে চেয়েছেন, কেমন আছে ছেলেমেয়েরা? কেউ হোমে, কেউ বা আত্মীয়ের বাড়িতে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়েছে বাবামায়ের চোখে। ভেঙে পড়েছেন কান্নায়। কলকাতা লিগ্যাল এইডের এক কর্তা বলেন, ‘অভিজ্ঞতা থেকেই জানি, একমাত্র আয়ের মানুষটা অপরাধে জড়িয়ে গেলে পরিবারটাই শেষ হয়ে যায়। ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো মানুষ হতে পারে না। পদে পদে লাঞ্ছনা অপেক্ষা করে তাদের জন্য। শাসনের অভাবে কুসঙ্গে পড়ে, বিপথগামী হয়। পরে তাদের আর মূল স্রোতে ফেরানো যায় না। তাই সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের সন্তানরা যদি ভালো পরিবেশে মানুষ হয়, লাভ সমাজেরই।’
জানা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জন বন্দির সঙ্গে কথা বলেছেন আধিকারিকরা। প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু সকলেই কি এতে রাজি হবেন? সন্তানকে অন্যের হাতে তুলে দেবেন? সেই প্রশ্ন থাকছে। তবে দুই দপ্তরের কর্তাদেরই বক্তব্য, ‘কয়েকজনের থেকেও যদি ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়, সেটাই প্রাপ্তি।’