পদে পদে বিপদ। প্রাণের ঝুঁকি যে কথার কথা নয়, তার প্রমাণ মাঝেমধ্যেই মিলছে। সব কিছু জেনেও তবু কেন সেই মৃত্যুকামী পিপীলিকার মতো আগুনের পানে ধেয়ে যাচ্ছেন ওঁরা?
প্রশ্নটা উঠছে একটাই কারণে। একের পর এক বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে মৃত্যু বেড়েই চলেছে। তার পরেও কেন এই কারবারে জান বাজি রাখছেন ওঁরা? দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাথরপ্রতিমার ঢোলাহাটের বণিক পরিবারই শুধু নয়, রাজ্যে জুড়ে বেশ কয়েকটি জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এমন অনেক পরিবার।
সোমবার রাতের বিস্ফোরণে বণিক পরিবার কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছে। তবে এমন ঘটনাও রয়েছে, বাজি তৈরি করতে গিয়ে পরিবারের দু’এক জনের মৃত্যুর পরেও অন্য সদস্যরা ফের বাজির বেআইনি কারবারেই জান কবুল করেছেন। বাজি ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, কারণটা আর কিছুই নয়, নামমাত্র বিনিয়োগ করে এই কারবারে বিপুল লাভ! তবে লাভের অংশ ‘প্রণামী’ হিসেবে পাঠাতে হয় অনেক জায়গায়। সে হিসেব বাদ দিলেও যা থাকে, অত কম বিনিয়োগ করে এত লাভ অন্য কারবারে সম্ভব নয়। এটা জেনেই বেআইনি বাজির কারবার ছাড়তে চাইছেন না ওঁরা।
পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুর, পূর্ব মেদিনীপুরের মেচেদা এবং এগরায় গত চার বছরে এমন কয়েকটি বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। যেখানে আগেও বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছিল একই পরিবারের সদস্যদের। গত বছর এগরায় বিস্ফোরণের পরেই উঠে এসেছিল এই প্রশ্ন।
চম্পাহাটি, নৈহাটি, কল্যাণী, দত্তপুকুর— কলকাতা লাগোয়া এই এলাকাগুলিতে রমরমিয়ে চলে বেআইনি বাজি তৈরির কারবার। বাজির কারবারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বিভিন্ন রাসায়নিক হলো বাজির মূল কাঁচামাল। রাসায়নিক নির্ভর বেশিরভাগ ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের মতো বাজি শিল্পেও লাভ আকাশছোঁয়া। সাধারণত ২০ টাকা বিনিয়োগ করে বাজি তৈরি করলে, সেই বাজি ১০০ টাকায় বিক্রি করা যায়। দত্তপুকুরের এক বাজির কারবারি বলেন, ‘কোনও কুটির শিল্পেই ৮০ শতাংশ লাভ নেই। সে জন্যই এই কারবারে একবার জড়িয়ে পড়লে প্রিয়জনের প্রাণহানির পরেও ফেরার রাস্তা থাকে না।’
চম্পাহাটির এক বাজির কারবারি অবশ্য বলেন, ‘৮০ শতাংশ মানে সেটা পুরোটাই যে আমাদের হাতে থাকে, তেমনটা নয়। এই টাকা ছোট ছোট অঙ্কে ভাগ হয়ে বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছয়। তার মধ্যে পুলিশ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি সরকারি অফিস। পাড়ার ক্লাবকেও টাকা দিতে হয়। সে সব বাদ দিয়েও লাভের হার ৫৫-৬০ শতাংশের কম থাকে না।’
কখনও কখনও পুলিশ বাজি বাজেয়াপ্ত করে। সে খরচও এ সবের মধ্যেই ধরা থাকে। আর এক বাজি ব্যবসায়ীর কথায়, ‘আসলে এই প্রণামীই হলো বেআইনি বাজি কারখানার লাইসেন্স।’ অভিযোগ, এর জোরেই বছরের পর বছর ঢোলাহাট-কল্যাণী-বজবজ-বারুইপুর-মহেশতলার বসতি এলাকায় রমরমিয়ে চলে বাজির বেআইনি কারখানা।
এই কারবার বন্ধের কি কোনও উপায় নেই?
পশ্চিমবঙ্গ বাজি শিল্প উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর মান্না বলেন, ‘সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। সাহস করে তাঁদেরই প্রতিবাদ করতে হবে। পুলিশের উপরতলার আধিকারিকদের নিয়মিত ভিজ়িটও জরুরি।’ সারা বাংলা আতশবাজি সংগঠনের নেতা মানব নাইয়া বলেন, ‘পঞ্চায়েতের ট্রেড লাইসেন্সকে বাজি কারখানার লাইসেন্স হিসেবে চালানো হচ্ছে। সরকার যদি সদিচ্ছা দেখায়, তবেই বন্ধ করা যাবে বেআইনি বাজির কারবার।’