হিসেব করতে বসেছিলেন প্রণব মানি। উত্তরবঙ্গের বেসরকারি বাসমালিকদের সংগঠন নর্থবেঙ্গল ট্রান্সপোর্ট ওনার্স কো–অর্ডিনেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং সারা বাংলার বেসরকারি বাসমালিকদের অন্যতম সংগঠন অল বেঙ্গল বাস–মিনিবাস সমন্বয় কমিটির সভাপতি তিনি। শিলিগুড়ি ছেড়ে একটি দূরপাল্লার বাসকে কলকাতা পৌঁছতে হলে পথে কতগুলো টোল প্লাজ়া পার করতে হয়, তারই হিসেবে ব্যস্ত ছিলেন প্রণব।
২০২৫–এর ৩১ মার্চ পর্যন্ত যাত্রিবাহী এই বাসগুলোকে প্রতি টোল প্লাজ়ায় ৪২৫ টাকা করে টোল দিতে হতো। কিন্তু ১ এপ্রিল থেকে টোলের পরিমাণ বেড়ে ৪৪০ টাকা করা হয়েছে ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটির নির্দেশে। প্রাথমিক হিসেবে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ির মধ্যে গোটা দশেক প্লাজ়ার নাম মনে পড়ল ওঁর। প্রতি প্লাজ়ায় অতিরিক্ত ১৫ টাকা করে দিতে হলে দিনে অন্তত ১৫০ টাকা বেশি টোল দিতে হবে। অর্থাৎ মাসের শেষে প্রতি বাসকে শুধু টোল–বাবদে অতিরিক্ত সাড়ে চার হাজার টাকা গুনতে হবে। কোথা থেকে আসবে সেই টাকা?
গত কয়েক বছর ধরে ডিজ়েলের দাম ক্রমশ বাড়তে বাড়তে ৯৩ টাকা প্রতি লিটারে এসে ঠেকেছে। জ্বালানি তেলের দাম নিয়ম করে বাড়লে কী হবে, যাত্রীদের ভাড়ার পরিমাণ বাড়ানো যায়নি সরকারি নির্দেশে। দক্ষিণবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতায় তবু ‘অনুদান’ বা ‘সাহায্যের’ নাম করে বাসকর্মীরা কিছুটা বেশি ভাড়া নিচ্ছেন যাত্রীদের থেকে। ‘প্রশাসনকে না জানিয়েই’ তাঁদের এই উদ্যোগ। ফলে রাজ্যের দক্ষিণে বাসে উঠলে অন্তত ১০ টাকার টিকিট কাটতে হয়। কিন্তু উত্তরবঙ্গে সেই সুযোগও নেই।
সেখানকার বাসকর্মীরা জানাচ্ছেন, এখনও ন্যূনতম সাত টাকা ভাড়াতেই বেসরকারি বাস চলে সেখানে। গত কয়েক বছর ধরে বেসরকারি ক্ষেত্রে বাস চালানোর খরচ বেড়েই চলেছে, আয়বৃদ্ধির কোনও সংস্থান করা হয়নি। ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টা প্রতিবারই ধামাচাপা পড়েছে রাজ্য পরিবহণ দপ্তরের বিরোধিতায়। ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটির টোল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত তাই বেসরকারি বাসমালিকদের কাছে আরও একটা ধাক্কা।
নর্থবেঙ্গল ট্রান্সপোর্ট ওনার্স কো–অর্ডিনেশন কমিটির পক্ষ থেকে প্রণব মানি বলছেন, ‘কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি আসার সময়ে বাসগুলোকে অন্তত দশটি টোল প্লাজ়া পার করতে হয়। প্রতিটা বাসকেই অতিরিক্ত টোল দিতে হবে। এছাড়াও উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার মধ্যে এমন বহু সংখ্যক বাস চলে যাদের টোল রাস্তা দিয়ে কিছুটা হলেও যেতে হয়। এই বাসগুলোকেও অতিরিক্ত টোল দিতে হবে। মনে রাখবেন, সরকারি বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এবং একই সঙ্গে রাজ্য সরকারের নির্দেশে আমরা ভাড়া বাড়াতে পারব না।’
সারা বাংলার বেসরকারি বাসমালিকদের সংগঠন অল বেঙ্গল বাস মিনিবাস সমন্বয় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাহুল চট্টোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রতিদিন অন্তত তিন হাজার বাস দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে যাতায়াত করে। কলকাতা ছাড়াও দুই মেদিনীপুর, বর্ধমান, দুর্গাপুর, আসানসোল, বহরমপুর, বাঁকুড়া, কৃষ্ণনগর, নবদ্বীপের মতো বড় জায়গা থেকে বাস উত্তরবঙ্গে পাড়ি দেওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণের জেলাগুলোর মধ্যেও টোল প্লাজা পার করে যাতায়াত করে। কাজেই খরচ বাড়ছে সকলের।’
কী ভাবে সেই খরচ তোলার কথা ভাবছেন বেসরকারি বাসমালিকরা? ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েই কি যাত্রীদের থেকে টাকা আদায় করা হবে? হতাশ মালিকরা জানাচ্ছেন, সরকারি নির্দেশে তেমন কিছু করার উপায় নেই বলে গচ্চা দিয়েই ‘ম্যানেজ’ করতে হবে তাঁদের। ইতিমধ্যেই অনেকে বাসের ব্যবসায় নামার জন্য নিজেদের দুষতে শুরু করেছেন। সমস্যা বেড়েই চলেছে, তবে সমাধান এখনও দূর অস্ত।