এই সময়: ২৪ ঘণ্টা আগে দেখা ভয়াবহ দৃশ্যটা এখনও চোখ বন্ধ করলে স্পষ্ট দেখছেন অরিন্দম বণিক। ঢোলাহাটে বাজির কারখানা মালিক চন্দ্রকান্ত বণিকের খুড়তুতো ভাই অরিন্দম থাকেন বণিকদের পাশের বাড়িতেই। গ্রামে একটি কোচিং ক্লাস চালাতেন অরিন্দম। চন্দ্রকান্তের বাড়ির পাশে সোমবার রাতেও চলছিল কোচিং। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বাচ্চাদের ছুটি দেওয়ার পর চোখের সামনে বৌদি ও তার ছয় মাসের ভাইঝিকে পুড়তে দেখেছেন অরিন্দম। চন্দ্রকান্তের ৯ বছরের ছেলেও এ দিন পড়তে এসেছিল অরিন্দমের কাছে। ছুটির পর বাড়িতে ফিরে সেও কাকার চোখের সামনেই ঝলসে মারা যায়।
মঙ্গলবার কান্নায় বুজে আসা ভাঙা ভাঙা গলায় অরিন্দম বলেন, ‘বাচ্চাগুলোকে ছুটি দেওয়ার পর ফোনটা হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে বসেছিলাম। হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনে দেখি শেল ফাটছে। উঠোনে দাঁড়িয়ে দেখলাম, বৌদি আর কোলের ভাইঝিটা পুড়ছে। বৌদি আমাকে হাত নাড়িয়ে বলছিল, ভিতরে আসিস না। মা আর বোনের দিকে তাকিয়ে চন্দ্রকান্তদার বাচ্চা ছেলেটাও ঘরের ভিতরে ঢুকে যেতেই মুহূর্তের মধ্যে ঝলসে গেল। ওকে যে আটকাব সেই বোধটাও কাজ করেনি।’
মঙ্গলবার বিকেলেই কাকদ্বীপ মহকুমা হাসপাতালের মর্গে চার শিশু–সহ সাতজনের ময়নাতদন্তের পর রাতেই কাকদ্বীপে মৃতদের শেষকৃত্য হয়। কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে মৃত সুতপা বণিকের দেহ আজ, বুধবার ময়নাতদন্তের পর শেষকৃত্য করা হবে বলে পরিবার সূত্রের খবর। একই পরিবারের আটজনের মৃত্যু হলেও তাদের জন্য কান্নার রোল ছিল না বাড়িতে। পরিবারের ১১ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র তিনজন জীবিত। দুই ছেলে চন্দ্রকান্ত ও তুষার বাড়ির বাইরে থাকায় বেঁচে গিয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর থেকে প্রতিবেশীদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁদের বৃদ্ধা মা মেনকা। শাশুড়ি, স্বামী, দুই বৌমা এবং চার নাতি নাতনির মৃত্যুর পর প্রতিবেশীর বাড়িতে বসে প্রলাপ বকে চলেছেন বৃদ্ধা। মাঝেমধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। কাঁদতে কাঁদতেই মেনকা বলেন, ‘ওই ব্যবসায় আমাদের সায় ছিল না। বারবার বড় ছেলেকে বলেছিলাম বন্ধ করে দিতে। কিন্তু ও আমাদের কথা না শুনে ছোট ভাইকে নিয়ে ব্যবসা করছিল। আমার সব জ্বলে গেল। বাচ্চাগুলোকে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে কি?’ বিকেলে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ৮-১০ বছর ধরে বণিকবাড়িতে চলছিল ওই বাজি কারখানা। পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ইদ্রিশ আলি মোল্লার দাবি, বাম আমল থেকে রয়েছে এই কারখানা। সোমবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে বিধায়ক সমীর জানা দাবি করেছিলেন, ওই কারখানার লাইসেন্স ছিল। কিন্তু চন্দ্রকান্তর বাজি বিক্রির লাইসেন্স থাকলেও ম্যানুফ্যাকচারের কোনও লাইসেন্স ছিল না বলে দাবি রাজ্য বাজি সংগঠনের কর্মকর্তা বাবলা রায়ের। তিনি বলেন, ‘চন্দ্রকান্তর জন্যই আজ পুলিশ প্রশাসন ও দলের মুখ পুড়ছে। সকলের নজর এড়িয়ে ওই অসৎ ব্যক্তি এই কারবার চালাচ্ছিল।’
বিস্ফোরণে যে বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে ফাঁকা মাঠের মাঝখানে রয়েছে কারখানা। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, বাজি তৈরির সামগ্রী থেকে শব্দবাজি সবই মজুত রয়েছে সেখানে। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে মাঠের মাঝে রাখা কয়েকটি বালতিতেও বারুদ ভরা। পড়ে রয়েছে বারুদ ভরা একাধিক বস্তাও। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলছেন, বণিক পরিবারের এতগুলো মানুষ মারা গিয়েছে। তাদের পক্ষে এই কাজটি করা সম্ভব ছিল? না কি বিষয়টি লুকনোর জন্য রাতের অন্ধকারে অন্য কেউ সরিয়ে ফেলেছিল বারুদের বস্তা?