শুরুতে অবাক হতেন। এখন আর হন না। ডাক্তারবাবুরা বুঝে গিয়েছেন, এখানকার সমাজে এটাই প্যাটার্ন। বহু মহিলার রোগ গোপন করার প্রবণতা। আর গোপন করার কারণ একাধিক।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের অনেকের উপলব্ধি, মহিলাদের নিজেদের রোগ গোপন করার পিছনে আর্থিক কারণের পাশাপাশি রয়েছে সংসার ও বাড়ির লোকজনের প্রতি ত্যাগ। কিন্তু এ সব কারণে রোগ পরে ধরা পড়ায় ক্যান্সারের লেজ ধরে চিকিৎসা শুরু করতে হচ্ছে। আর তাতেই ঝরছে অসংখ্য প্রাণ। অথচ শুরুতে রোগ নির্ণয় করা গেলে এখন ক্যান্সারের চিকিৎসাকে ততটাও জটিল বলে মনে করেন না বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এই সমস্যা সমাধানে স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। কী ভাবে? বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, পড়ুয়াদের সচেতনতা বাড়লে তারাই মা-কাকিমা–জেঠিমাদের ক্লিনিকে নিয়ে যাবে এবং তা হলে অনেক ক্ষেত্রেই শুরুতেই নাগাল পাওয়া যাবে ক্যান্সারের।
ক্যান্সার শল্য-চিকিৎসক গৌতম মুখোপাধ্যায় বলছেন, 'একটা সময়ে এ রাজ্যে মহিলাদের মধ্যে সব চেয়ে বেশি দেখা যেত জরায়ুমুখের ক্যান্সার। বর্তমানে মহিলারা সব চেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন স্তন ক্যান্সারে।' ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) এবং ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজ়িজ় ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড রিসার্চ (এনসিডিআইআর)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, গড়ে বাংলায় মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তদের হার প্রায় ২৫ শতাংশ। তার পরেই জরায়ুমুখের ক্যান্সার— হার প্রায় ১০ শতাংশ। তার পর হলো, জরায়ুর ক্যান্সার এবং ও গলব্লাডারের ক্যান্সার— হার যথাক্রমে ৮ ও ৭ শতংশ।
গৌতম বলছেন, 'স্তন ক্যান্সারের সমস্যা দিনকে দিন বেড়ে চলেছে, বাগে আনা যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হলো, অসুবিধে হচ্ছে জেনেও বহু মহিলা বাড়ির লোকেদের তা জানাতে চান না। আমরা যখন জিজ্ঞেস করছি, তখন বলছেন, 'ছেলেমেয়ের পরীক্ষা চলছিল। ভেবেছিলাম, ওদের উচ্চ মাধ্যমিক হওয়ার পর বলব।' গৌতমের কথায়, 'এই যে ত্যাগটা ওঁরা করলেন, তার ফলে রোগটা চলে গেল আমাদের আয়ত্তের বাইরে। চিকিৎসার সুযোগই পেলাম না। এটা কিন্তু ঘটেই চলেছে।'
আর এক সিনিয়র ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ সায়ন পালও বলছেন, 'আমাদের কাছে বহু মহিলা একেবারে লাস্ট স্টেজে এসেছেন। তখন আমাদের রোগের লেজ ধরে চিকিৎসা করতে হচ্ছে। এটা এমন একটা রোগ, যার সঙ্গে শুরুতেই লড়াই না–করলে এঁটে ওঠা মুশকিল।' সায়নেরও বক্তব্য, 'বাঙালি মহিলাদের অধিকাংশ এখনও নিজেদের রোগ নিয়ে পরিবারকে জানাতে কুণ্ঠাবোধ করেন। তার একটা কারণ, বাংলার গড়পড়তা নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা না–থাকা। চিকিৎসার খরচের বোঝা পরিবারের উপর তাঁরা চাপাতে চান না।' কিন্তু শেষমেশ জানাতেই হয় এবং খরচ আটকানোর উপায় থাকে না— এমনটাই বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন।
বহু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞর মতে, স্কুল–কলেজের পড়ুয়াদের নিয়ে সচেতনতা শিবির করে সেখানে রোগের লক্ষণ থেকে শুরু করে চিকিৎসার বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া দরকার। সে ক্ষেত্রে তারাই বাড়ির বড়দের সঙ্গে কথা বলে রোগের উপসর্গ নিয়ে আলোচনা করবে এবং তেমন বুঝলে চিকিৎসকের কাছে যেতে জোর করবে।