গরম হাওয়া বেরনোর সব রাস্তা বন্ধ! বহুতলের বাড়বাড়ন্তেই তাপমাত্রা বাড়ছে শহরের
প্রতিদিন | ০২ এপ্রিল ২০২৫
নব্যেন্দু হাজরা: রাতের কলকাতায় গরম বাড়ছে। ‘আর্বান হিট আইল্যান্ডের’ গেরোয় আশপাশের এলাকার তুলনায় দ্রুত তাপমাত্রা বাড়ছে কলকাতার। যার একটা বড় কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ।
ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) রিপোর্ট বলেছে, শহরাঞ্চলে বায়ু চলাচলের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে নগরায়নের বাড়াবাড়ি। সূর্যের তাপ ঢুকছে, কিন্তু সবটা বেরিয়ে যেতে পারছে না। বিশেষত গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে সন্ধের পর। মানুষের কাজকর্মের জন্যও বিপুল তাপ তৈরি হচ্ছে শহরের মধ্যে। চাষের জমি নেই, গাছপালা কম, জলাশয়ের অভাব। এসবই গরম বৃদ্ধির কারণ। একের পর এক বহুতল মাথাচাড়া দিচ্ছে। থাকছে না দুই বহুতলের ব্যবধান। ফলে সন্ধের পর তাপমাত্রা বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। কংক্রিটের জঙ্গল আর বিভিন্ন ইমারতি পরিকাঠামো তাপ শুষে নিচ্ছে। গায়ে গায়ে বহুতল, বড় বাড়ি, গড়ে ওঠার কারণেই রাতের তাপমাত্রা বেশিই থাকছে শহরে। অফিস কারখানা বা বাড়ির হিটিং, কুলিং সিস্টেম থেকে বেরনো তাপও দায়ী শহরে গরম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসাবে। যেমন, এসি ঘর ঠান্ডা রাখে। কিন্তু গরম বাতাস ছাড়ে বাইরে। ফলে সার্বিকভাবেই তৈরি হচ্ছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। শহরের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ বেলুড় লালবাবা কলেজের সহকারী অধ্যাপক আনসার খান বলেন, “যেমন খুশি নগরায়নের জেরে বাতাস চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় তাপ বেরোতে পারে না। রাত হলে যখন তাপমাত্রা বেরনোর কথা, তখনই তা ধাক্কা খায়। ফলে মফঃস্বল, জেলা বা একটু গ্রামের দিকে তাপমাত্রা এবং গরম কমলেও শহরে তা কমতে চায় না। থার্মাল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কোনও নীতি নেই। সচেতনতা নেই।”
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মধ্য কলকাতায় বড়বাজার, ডালহৌসি, দক্ষিণ কলকাতায় বালিগঞ্জ, রাসবিহারীতে শহরের অন্য অঞ্চলের তুলনায় তাপমাত্রা অনেক বেশি। সল্টলেক বা পূর্ব কলকাতায় তাপমাত্রা তুলনায় কম। আইপিসিসি-র পর্যবেক্ষণ, গ্রামের চেয়ে শহরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা বেশি। তাই নগরায়নকেই আংশিকভাবে দায়ী করেছেন বিজ্ঞানীরা। গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার চেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে গড় তাপমাত্রায়। এর অন্যতম কারণ, শহরাঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা অর্থাৎ রাতের তাপমাত্রা বাড়ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ হিমাদ্রি গুহ বলেন, “একবার সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, এখন গ্রামের থেকে শহরের তাপমাত্রা চার ডিগ্রি বেশি। তার একটা বড় কারণ উঁচু উঁচু বহুতল। বিল্ডিংয়ের গায়ে যে সারাদিন রোদ পড়ে, তা গরম ধরে রাখে। অন্ধকার হলে গরমটা বেরোতে থাকে। কিন্তু গ্রামে যেভাবে বেরিয়ে যায়, শহরে বহুতলের গায়ে তা বাধাপ্রাপ্ত হয়।”
শহর থেকে জেলা সব জায়গাতেই রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শহরাঞ্চলে এই বৃদ্ধির প্রবণতা বেশি হতে পারে। আসানসোল, দুর্গাপুর, হলদিয়ার মতো শহরেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। তবে শহরে গরম বাড়ার ক্ষেত্রে দূষণও একটা কারণ। উপকূলের থেকে বেশি দূরে নয়, আবার পাশে নদী। ফলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি। ধুলোরও অভাব নেই। আর এই দুইয়ের জেরেই সকালের দিকে ধোঁয়াশায় ঢাকা থাকে শহর। সেক্ষেত্রে যে তাপ দিনে ঢোকে, রাতে তা বেরতে পারে না। ধোঁয়াশায় বাধাপ্রাপ্ত হয়। আইপিসিসির রিপোর্টে জানানো হয়েছে, আগামী দিনের নগরায়নের ফলে গড় তাপমাত্রা আরও বাড়বে। তাপপ্রবাহ বাড়বে। বাড়বে গরমের দিন, উষ্ণ রাতের সংখ্যাও।