শুভজিৎ ঘোষ ■ টেনেসি
আমেরিকার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এক যুগ আগে। বলতে পারেন, কর্মসূত্রে বিদেশযাত্রা। সেই প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। মনে পড়ে সে দিনটার কথা। কানেক্টিং ফ্লাইট ধরার জন্য এয়ারট্রেনে উঠেছিলাম। ট্রেনটা যখন টার্মিনালের বাইরে যাচ্ছে, তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু আমেরিকার মাটিতে পা রেখে মন ভালো হয়ে গিয়েছিল। ওখানকার রাস্তা, আবহাওয়া, পরিবেশ—সব যেন মন ভরিয়ে দিয়েছিল। পরে বুঝেছি, ওটা মনের মুক্তি নয়।
আমার বিশাল শিকড় ছড়িয়ে আছে কোচবিহারের সর্বত্র। কিন্তু মূল শিকড় রয়ে গিয়েছে 'ত্রিবৃত্ত সরণি'তে। ছোটবেলায় পাড়ার গলিররাস্তায় ক্রিকেট-ফুটবল, আর পিট্টু খেলা ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে সময়ের জ্ঞান থাকত না বলে কত যে বকুনি খেয়েছি, তার হিসেব নেই। ভিডিয়ো গেমস-এর চল তখন ছিল না। ১৯৮৭ সালে বাড়িতে প্রথম টিভি এল। পাড়ার লোকজন ভিড় জমাতেন রামায়ণ দেখতে। সেই মুহূর্তগুলো আজও মনের মধ্যে ঝলমল করে। জেনকিন্স স্কুলের পরে দিনহাটা কলেজ। পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়েছি। এরপর এমসিএ। এখন কাজ করি ক্লাউড কম্পিউটিং আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। বড় বড় কোম্পানিগুলো নানা সমস্যার সমাধানে পরামর্শ নেয় আমার কাছে।
এখন আমার ঠিকানা- টেনেসি। এখানে বাঙালিদের মধ্যে গভীর বন্ধন। সরস্বতী পুজো, পয়লা বৈশাখ, দুর্গাপুজো—এ সব উৎসবে যেন এক টুকরো বাংলাকে ফিরে পাই। নাটক, গান, আড্ডা, আর খাওয়াদাওয়া- মন ভরে যায়। সব কিছুর সঙ্গে খুব সচেতন ভাবে চলে বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা, যা কি না নিজেদের সমৃদ্ধ তো করেই, সঙ্গে পরের প্রজন্মকেও শেখায়। কেন জানি মনে হয়, এখানে আমরা নিজের দেশের থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। ইলিশ থেকে শুরু করে সব রকমের মাছ, আনাজ, মিষ্টি, ফুচকা, নলেন গুড়– কী নেই এখানে? কখনও মনেই হয় না যে, আমরা পশ্চিমবঙ্গে নেই।
তবু কোনও কোনও সময়ে মনটা বড্ড খাঁ খাঁ করে। মনে হয়, যদি একবার ভূতের রাজার একটা বর পেতাম, তা হলে যখন খুশি বাবা–মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসতাম। আবার রাসমেলার সময়ে কোচবিহারে যেতাম। টমটম গাড়ি কিনতাম। সার্কাস দেখতাম। নাগরদোলায় উঠতাম। তার পরে ভেটাগুড়ির বিখ্যাত জিলিপি খেয়ে বাড়ি ফিরতাম। অনেক সময়ে মনে হয়, রোজ সন্ধেবেলায় বন্ধুরা মিলে সাগরদিঘির ধারে নির্ভেজাল আড্ডা জমাই, উল্টো দিকের বিশুদা, হারুদার দোকান থেকে চপ, কাটলেট, ঘুগনি, ফুচকা খেয়ে আবার ফিরে আসি ঝট করে ভূতের রাজার বরে। বইমেলার সময়ে ওখানে গিয়ে নতুন নতুন বইয়ের গন্ধ গায়ে মেখে যদি নিতে পারতাম, তাহলে কী মজা-ই না হতো। যদি সেই ভূতের রাজা–র বর মায়ের অসুস্থ থাকার চিন্তা, পরিবারের নানা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না–পারার হাহাকার ভুলিয়ে দিতে পারত, কী ভালোই না হতো।
তবে বাস্তব সব সময়েই খুব কঠিন। কিন্তু ভাবতে তো বাধা নেই। মনের ভাবনাকে কে-ই বা কবে বেড়ি পরাতে পেরেছে। এ সব ভাবনা যেন প্রতিদিন আরও গভীর ভাবে জাগিয়ে তোলে শিকড়ের স্মৃতি। বাবা বলতেন, 'শিকড়ের টান ভাষায় বোঝানো যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।' আমি এখন সেই শিকড়ের টান প্রতি মুহূর্তে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে অনুভব করি।