অর্ঘ্য বিশ্বাস ■ জলপাইগুড়ি
এক সময়ে জমিতে ধান ফলানোর উপায় ছিল না। ফসল ঘরে ওঠার আগেই তা সাবাড় করত বুনোরা। তাই এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয় ক্ষুদ্র চা বাগান। আর তাতেই বদল আসে বনবস্তির জীবনযাত্রায়। জঙ্গলের ভিতর থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করাই ছিল যাঁদের রোজনামচা। এখন তাঁরা দল বেঁধে চা পাতা তোলেন। কয়েক বছর আগেও হাতি ও অন্য বুনোদের ভয় উপেক্ষা করে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে জ্বালানি কাঠ আনতে তাঁরা পাড়ি দিতেন গভীর জঙ্গলে। এখন তাঁদের মুখে হাসি ফুটেছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নতির গ্রাফ।
স্থানীয় বাসিন্দা বীরেন কোরা বলেন, 'জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় সবজি বা ধান চাষ করে ফসল ঘরে তোলা ছিল খুবই কঠিন বিষয়। বনবস্তিতে আগে চাষবাস হলেও গত কয়েক বছর ধরে তা একেবারে বন্ধ।' বিছাভাঙা বনবস্তির ভগবতী কোরা, চন্দ্রমা কোরা, মুক্তামণি কোরা ও সুরস্রুতি বনবস্তির লক্ষ্মী ওঁরাও, জাগনী ওঁরাওদের কথায়, 'এক সময়ে জঙ্গল থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করেই বাড়িতে উনুন চড়ত। চা বাগান আমাদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।' কেজি প্রতি পাঁচ থেকে ছ'টাকা দরে চা পাতা তোলার কাজ করে কিছুটা হলেও বাড়তি আয়ের মুখ দেখছেন তাঁরা। সারাদিনে ৬০ থেকে ৭০ কেজির মতো পাতা তোলেন বলে জানালেন মহিলারা।
মেটেলি ব্লকের আওতায় থাকা গোরুমারা জঙ্গল ঘেঁষা বিছাভাঙা ও সুরুসুতি বনবস্তির মহিলারা আজ স্বনির্ভর হয়েছেন চা পাতা তোলার কাজ করে। ময়নাগুড়ি ব্লকের রামশাই বনবস্তিতেও গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি চা বাগান।
গোরুমারা সাউথের যৌথ বন পরিচালন কমিটির সভাপতি সুবল পাইকের কথায়, 'বছর কয়েক আগে বনবস্তিজুড়ে বেশ কয়েকটি ছোট চা বাগান গড়ে তোলা হয়। বিশেষজ্ঞদের মত নিয়ে এখানে ধানের বিকল্প হিসেবে শুরু হয় চা চাষ। বনবস্তির মহিলারাই বাগানের কাজকর্ম করেন৷' শুধু বিছাভাঙা বা সুরুস্রুতি নয় বামনী বনবস্তির মহিলারাও এখন সেই কাজে হাত লাগিয়েছেন বল জানিয়েছেন তিনি।
জলপাইগুড়ি জেলার ক্ষুদ্র চা চাষি সমিতির সম্পাদক বিজয়গোপাল চক্রবর্তীর বক্তব্য, 'গত দশ বছরে বনবস্তিতে বেশ কিছু ক্ষুদ্র চা বাগান গড়ে ওঠায় আয়ের মুখ দেখেছেন এলাকাবাসী৷ স্বনির্ভর হচ্ছে মহিলারাও। আনাজের বিকল্প হিসেবে অনেকেই অর্থকরী চা চাষে সাফল্য পেয়েছেন।'
এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব চা উৎপাদনে বনবস্তিজুড়ে ছায়া গাছ লাগানোর পাশাপাশি চা চাষিদের সচেতন করছেন তাঁরা। উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে পরিবেশপ্রেমী অণির্বাণ মজুমদার বলেন, 'সম্প্রতি চা বাগানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণের আনাগোনাও বেড়েছে এলাকায়। সে ক্ষেত্রে বন্যের সঙ্গে মানুষের সংঘাত রুখতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন থাকতে হবে।'