এই সময়: কাজটা খুব সহজ। একটা ওয়েবসাইট খুলতে হবে। সেখানে আপলোড করতে হবে নিজের অথবা পছন্দের কোনও ছবি। সেই ওপেন এআই সাইটকে নির্দেশ দিতে হবে, তুমি এই ছবিটাকে জিবলি আর্টে পরিণত করো। ব্যাস, তারপর বড়জোড় কয়েক মিনিটের অপেক্ষা। আপনার সেই ছবি চকিতে পরিণত হবে একটি আর্টে। মনে হবে, যেন সময় নিয়ে কেউ যত্ন করে এঁকে দিয়েছে ছবিটা। তারপর আর কী, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট। লাইক, শেয়ার, কমেন্টের বন্যা।
এই ট্রেন্ডেই এখন গা ভাসিয়েছেন নেট-নাগরিকরা। যেখানে শয়ে শয়ে পোস্ট নজরে পড়বে, সেখানে মানুষ নিজেকে জিবলি আর্টে দেখতে চাইছেন। শহর কলকাতা ছাড়িয়ে জেলা, জেলা সদরেও ফেসবুক খুললেই শুধু জিবলি আর জিবলি। ওপেন এআই চ্যাট জিপিটিকে ব্যবহার করে এখন এই স্রোতে গা ভাসিয়েছেন মানুষ।
যাঁরা এখনও জিবলির জাদুতে নিজেকে দেখেননি, আফশোস ঘিরেছে তাঁদের। মেদিনীপুরের এক ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার নিজের তোলা দু’টি বাঁদরের ছবি জিবলিতে রূপান্তরিত করেছেন। যা দেখে আবার অন্য একজন ফেসবুকে আফশোস করে লিখেছেন, ‘শুধু আমিই বাদ রয়ে গেলাম। বাঁদররাও জিবলি করে ফেলল..!’
আসলে স্টুডিয়ো জিবলি একটি অতি প্রশংসিত জাপানি অ্যানিমেশন ফিল্ম স্টুডিয়ো। ১৯৮৫–তে অ্যানিমেটর এবং পরিচালক মিয়াজ়াকি হায়াও এবং তাকাহাতা ইসাও এবং প্রযোজক সুজুকি তোশিও — এই তিনজন মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্টুডিয়ো জিবলি। শৈল্পিকতার জন্য সারা পৃথিবীতেই সে একটি পরিচিত ব্র্যান্ড। সদর দপ্তর টোকিও-তে। সম্প্রতি ওপেন এআই-এর চ্যাটজিপিটি তাদের নতুন ফিচার নিয়ে এসেছে। যে কোনও ছবি দিয়ে কয়েকটি সহজ স্টেপ অবলম্বন করলেই অ্যানিমেশন স্টাইলে ছবি তৈরি হয়ে যাবে। তাতে অবশ্য থাকছে না কোনও ‘কার্টেসি’।
পরিচালক প্রতিম ডি গুপ্ত অবশ্য এই পয়েন্টেই নৈতিকতার প্রশ্ন উসকে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছেন, ‘মিয়াজ়াকির জন্য এই প্রবণতা নৈতিক ভাবে ভয়ঙ্কর। তিনি কয়েক দশক ধরে আবেগ ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে এমন একটি কিংবদন্তি সৃষ্টি করেছেন। অথচ তাঁর শিল্পকর্ম অনায়াসে ওপেন এআই-তে একটি অ্যালগরিদম বা প্রম্প্টের মাধ্যমে তৈরি হয়ে যাচ্ছে। তাঁর অনুমতি, সম্মতি, স্বীকৃতি ছাড়াই। সৃজনশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক নীতিকে লঙ্ঘন করছে।’ নেট-নাগরিকদের প্রতি প্রতিমের অনুরোধ, ‘অনুগ্রহ করে কোনও ট্রেন্ডে শুধু ‘কিউট’ লাগছে বলে যোগ দেওয়ার আগে যথাযথ গবেষণা করুন— এটি এমন একটি সত্যিকারের শিল্পকর্মের নকল, যা নির্মাতাদের প্রতি এক সরাসরি অবমাননা।’
কর্মসূত্রে কর্নাটকে থাকেন গড়বেতার বাসিন্দা অতনু সামন্ত। ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফিতে তিনি পরিচিত নাম। সোশ্যাল মিডিয়াতেও খুব অ্যাক্টিভ। নিজের এবং স্ত্রীর আলাদা এবং একসঙ্গে একাধিক ‘জিবলি’ ছবি বানানোর পাশাপাশি দুটি বাঁদরের জিবলিও বানিয়েছেন। কেন? অতনুর কথায়, ‘পুরো নেটদুনিয়া মেতে রয়েছে জিবলিতে। প্রত্যেকে যে যার নিজের পছন্দের ছবি দিয়ে কার্টুন বানাচ্ছেন। তাই আমিও.....’
অতনু যতটা সহজে এই ‘আর্ট ফর্ম’-কে গ্রহণ করেছেন, আর্টিস্টদের অনেকেই কিন্তু তা করতে পারছেন না। নবীন চিত্র শিল্পী সমণ্বয় দে, শর্মিষ্ঠা মিত্র, দেবাদিত্য ঘোষদের কথাই ধরা যাক। তাঁরা নির্দিষ্ট শ্রম ও পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ছবি আঁকেন। বিশেষ করে হিউম্যান-পোট্রেট আঁকেন। সমণ্বয়ের আশঙ্কা, ‘যে কাজটা করতে আমাদের এক সপ্তাহ বা দশদিন লাগছে, সেটাই এখন পাঁচ মিনিটে চ্যাট জিপিটি করে দিচ্ছে। এই ভাবে চলতে থাকলে আমাদের কাছে আর কেউ আসবে?’ শিল্পী সনাতন দিন্দা অবশ্য নবীনদের আশ্বস্ত করে বলছেন, ‘এসব যত হবে, ততই শিল্পীদের কদর বাড়বে। শত চেষ্টা করলেও চ্যাট জিপিটি একটা কোনারক মন্দির তৈরি করতে পারবে না। তাই হিউম্যান টাচের জন্য মানুষকে মানুষের কাছেই ফিরে আসতে হবে।’
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক অন্তরা রায় বলছেন, ‘প্রাচীন কাল থেকেই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়েছে মানুষ। এই সব ট্রেন্ড খুব ক্ষণস্থায়ী। হুজুগ বলা চলে। ভালো লাগছে, তাই করছি, কাল আবার একটা নতুন জিনিস আসবে, এটাকে ভুলে যাবো। এই ভাবেই চলে ট্রেন্ড।’ অবশ্য এই বিশেষ ট্রেন্ডে রয়েছে সাইবার অপরাধের প্রবণতাও। কী ভাবে? সাইবার আইন বিশেষজ্ঞ বিভাস চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘ওপেন এআই মানে তার সমস্ত ডেটাই ওপেন। সেখানে নিজের ছবি আপলোড করা মানে যেচে সেই ছবি সাইবার অপরাধীদের হাতে তুলে দেওয়া। এরপর সেখান থেকে তা চুরি করে ছবি বিকৃত করে যদি কোনও ঘটনা ঘটে, তার জন্যও কিন্তু ট্রেন্ডে ভাসা মানুষকে প্রস্তুত থাকতে হবে।’