১১ বছর পর পর সক্রিয়তা বেড়ে যায় সূর্যের। এই পর্বে প্রায় দেড়–দু’বছর ধরে সূর্য থেকে নানা শক্তিশালী রশ্মি তীব্রতার সঙ্গে ছড়ায় মহাকাশে। ছড়িয়ে পড়ে তড়িৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং ‘বৈদ্যুতিক ঝড়’। বিজ্ঞানের ভাষায় সূর্যের এই অবস্থাকেই ‘সোলার ম্যাক্সিমা’ বলে। ১১ বছর অন্তর সূর্যের এই ‘অতি সক্রিয়তা’র কারণে বিঘ্ন ঘটে নানা বৈদ্যুতিক এবং বৈদ্যুতিন যোগাযোগ ব্যবস্থায়।
কিন্তু সূর্য নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা আগ্রহের সঙ্গে এই সময়টার অপেক্ষাতেই থাকেন নতুন কিছু পাওয়ার আশায়। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র বহুমূল্যের বহু যন্ত্রপাতি সাজিয়ে সূর্য থেকে আসা নানা ধরনের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে তথ্য সংগ্রহে মন দেয়। এই তালিকায় রয়েছে কলকাতার ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজ়িক্স (আইসিএসপি)। তবে এই প্রতিষ্ঠান কোনও মহাকাশযান নয়, হাই অল্টিটিউড বেলুনের সাহায্যে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
বুধবার কলকাতায় শুরু তিন দিনের এক বিশেষ কর্মশালায় সোলার ম্যাক্সিমা নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা ঘোষণা করলেন আইসিএসপি–র গবেষকরা। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘সামনের কয়েক মাসে আমরা পর পর ন’টি হাই অল্টিটিউড বেলুন উৎক্ষেপণ করতে চলেছি। প্রতিটা বেলুনেই তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি (পে লোড) থাকবে, তবে ওজন খুব বেশি হলে পাঁচ থেকে ছ’কিলোগ্রাম হবে। ফলে খুবই কম খরচে গবেষণার কাজ সম্পন্ন হয়। কাজ শেষে বেলুনটি ফিরিয়ে আনা হয় বলে দূষণও হয় না।’
বীরভূমের সিউড়ির কাছে চন্দ্রপুরে সংস্থার বেলুন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র রয়েছে। ছ’বিঘা এলাকায় বিস্তৃত এই কেন্দ্রটি পূর্ব ভারতের একমাত্র বেলুন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র। মঙ্গলবার মুকুন্দপুরে আইসিএসপি–তে উপস্থিত ছিলেন একদল বিদেশি বিজ্ঞানীও—রাশিয়ার মার্গারিতা সাফোনোভা, সৌদি আরবের আশরাফ মহম্মদ সামির ফারহাত এবং জাপানের কেইসুকে মায়েদা। গবেষণার ক্ষেত্রে অতি–উচ্চতার বেলুনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন মৌসম ভবনের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার উপ–মহাধ্যক্ষ সোমনাথ দত্তও। অনুষ্ঠানে নিজেদের কাজ নিয়ে বলার সুযোগ পান তরুণ গবেষকরাও। এঁদের অন্যতম রূপনাথ সিকদার। তিনি চন্দ্রপুরের কেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা বেলুন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণা চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে পাঁচটি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
১৭৮৩ সালে প্রথম হাই অল্টিটিউড বেলুন উৎক্ষেপণ করে বাতাসের একেবারে উপরের দিকের স্তর নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। এর পর প্রায় আড়াইশো বছর পার হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি বেলুন এখন ৪৩ কিলোমিটারেরও বেশি উচ্চতায় তুলে গবেষণা চালাতে পারেন বিজ্ঞানীরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের বেলুনের তাৎপর্য বেড়েছে। এই ধরনের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য নজির গড়েছে কলকাতার আইসিএসপি–ও।