২০১৬ সালের এসএসসি মামলার রায় শুনে ভেঙে পড়েছেন চাকরিহারা শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীরা। যোগ্য ও অযোগ্য প্রার্থী আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব না হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বাতিল পুরো প্যানেল। বৃহস্পতিবার সকালে এই রায় শোনার পর থেকেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে দীপঙ্কর আদকের। তিরিশোর্ধ্ব এই যুবক ২০১৬ সালে এসএসসি মারফত পেয়েছিলেন নিয়োগ। সরকারি চাকরি পাওয়ার আনন্দ আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিশাপ। একা দীপঙ্কর নন, এমনই বহু উদাহরণ রয়েছে। যাঁরা এ দিন স্কুলে ঢুকে প্রার্থনায় যাওয়ার ঠিক আগে জানতে পেরেছেন তাঁদের চাকরি আর নেই।
চোখে সর্বস্ব হারানোর যন্ত্রণা, শূন্য দৃষ্টি। প্রশ্ন করায় দীপঙ্কর বললেন, ‘নিরপরাধও যে শাস্তি পেতে পারে তা আগে জানা ছিল না। আমার বা আমার মতো ৮৯ শতাংশ যোগ্য শিক্ষক আছে, তাঁদের তো ওএমআর থেকে সবই রয়েছে পাবলিক ডোমেনে। আমরা তো যোগ্য হিসেবেই চাকরি পেয়েছি। আমাদের বিরুদ্ধে তো কোনও অভিযোগ নেই। তাঁদের সঙ্গে কেন এমন হলো?’
গলা বুজে এল কান্নায়। ছল ছল করে ওঠা চোখটা ঘামে ভেজা জামায় মুছে দীপঙ্কর বললেন, ‘আমাদের পরিবারগুলোর কী হবে বলুন তো? মান-সম্মান, আর্থিক অবস্থান সব গেল। এতো সামাজিক অসম্মান। কোথায় দাঁড়াবে পরিবারগুলো? একবার তো ভেবে দেখা উচিত ছিল। বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা একটু ভেবে দেখুন প্লিজ়।’
ধর্মতলার হাওয়ায় আজ মিশে সর্বস্বহারাদের যন্ত্রণা। সুপ্রিম কোর্টের রায় শুনে ক্ষোভে ফুঁসে উঠলেন প্রতাপ রায়চৌধুরী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। সরকারি চাকরি ও শিক্ষকতার নেশায় এসএসসি পরীক্ষায় বসা। চাকরিও পেলেন। কিন্তু, সেই চাকরি যে চলে যেতে পারে তা কখনও ভাবতে পারেননি। বৃহস্পতিবার রায় শোনার পর নিরপরাধ হলেও চাকরি যাওয়ার খবরে সিস্টেমের উপর ক্ষোভ উগড়ে দিলেন গোসাবার সেন্ট্রাল জেলের এমসি হাইস্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক। বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে মরে গেলে বেঁচে যাব। চাকরি না পাওয়া এক জিনিস আর চাকরি পেয়ে এ ভাবে চলে যাওয়া আর এক জিনিস। আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রাক্তন ছাত্র। চাইলে অন্য পেশায় যেতে পারতাম। কিন্তু ভালোবেসে এসেছিলাম। আজ এই প্রতিদান পেলাম।’
উল্লেখ্য, এসএসসি নিয়োগে ওঠে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। কোনও ভাবেই যোগ্য-অযোগ্য আলাদা করতে সক্ষম না হওয়ায় গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি, নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশের সমস্ত নিয়োগ, অর্থাৎ ২০১৬ সালের পুরো প্যানেল বাতিল করে দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি মহম্মদ সব্বর রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্টও সমস্ত সওয়াল জবাব শোনার পর যোগ্য ও অযোগ্যের পৃথকীকরণ সম্ভব না হওয়ায় প্যানেল বাতিলের রায়কেই বহাল রাখল। চাকরিহারা ২৫ হাজার ৭৫৩ জন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী।