• জঙ্গলে আগুন রুখতে এ বার ছৌ নাচের আসর বন দপ্তরের
    এই সময় | ০৩ এপ্রিল ২০২৫
  • প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া

    শীতের মরশুম শেষ হতেই পাতা ঝরতে শুরু করে জঙ্গলে। তার সঙ্গে শুরু হয় জঙ্গলের শুকনো পাতায় আগুন ধরানোর মতো ঘটনা। বেশ কয়েক বছর ধরে রাজ্যের জঙ্গলমহল নামে পরিচিত পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পূর্ব বর্ধমানের গড়জঙ্গল আগুনে ক্ষতির মুখে পড়ছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন বন দপ্তর। সম্প্রতি বাঁকুড়ার শুশুনিয়া, পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় ও লাগোয়া ব্লকগুলির জঙ্গলে আগুনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি নজরে এসেছে বনকর্তাদের।

    আগুনের হাত থেকে জঙ্গল ও বন্যপ্রাণ বাঁচাতে সচেতনতা প্রচার কর্মসূচি শুরু করেছে বন দপ্তর। তার জন্য কাজে লাগানো হচ্ছে ছৌ শিল্পীদের। পথনাটিকার মাধ্যমে তাঁরা আগুনের ভয়াবহতা ও জীববৈচিত্র রক্ষার বিষয়টি তুলে ধরছেন। বন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরে ইতিমধ্যে ৩১টি জঙ্গলে আগুন ধরেছে। জঙ্গলের আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে বন দপ্তর তিনটি ভাগ করেছে। বড়, মাঝারি ও ছোট। ছোট আগুন দেড় থেকে দু’ঘণ্টায় আয়ত্তে আনা যাচ্ছে। মাঝারি আগুন আয়ত্তে আনতে সময় লাগছে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। কিন্তু বড় আগুনের ক্ষেত্রে সময় লাগে অনেক বেশি।

    অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে বলরামপুর রেঞ্জের ঘাটবেড়া-কেরোয়া বিট এলাকার বেড়সা পাহাড় লাগোয়া জঙ্গলের আগুন ইতিমধ্যে ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তালিকায় নথিভুক্ত হয়েছে। প্রায় দিন দুয়েকের চেষ্টায় এই আগুন আয়ত্তে আসে। এই ঘটনার পরেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে। পুরুলিয়া বন বিভাগের ডিএফও অঞ্জন গুহ জানান, আগুন লাগলে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়ে জীব বৈচিত্র। অযোধ্যা রেঞ্জ হচ্ছে প্রাকৃতিক জঙ্গল। এক একটি আগুনের ঘটনায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যায় লতাগুল্মও। জঙ্গলের গভীরে থাকা প্রাণীরাও পুড়ে মারা যায়। এতে সামগ্রিক ভাবে ক্ষতি হয় পরিবেশের। তিনি বলেন, ‘আমরা ছৌ নাচের বিভিন্ন চরিত্র বা পথনাটিকার মাধ্যমে জঙ্গলে আগুন লাগানো নিয়ে সতর্কতামূলক প্রচার চালাচ্ছি।’

    সাধারণত পৌরাণিক পালা করে থাকেন ছৌ শিল্পীরা। এ ক্ষেত্রে কী ভাবে আগুনের হাত থেকে জঙ্গলকে সুরক্ষিত রাখার বার্তা দিচ্ছেন ছৌ শিল্পীরা? বাঘমুন্ডির ছৌ শিল্পী শচীন মাহাতো বলেন, ‘জঙ্গলে আগুন লাগলে গাছপালার সঙ্গে বিপন্ন হয়ে পড়ে বন্যপ্রাণও। আমাদের পালায় হাতি, হায়না, বানর, ময়ূর, নেকড়েদের মতো বন্যপ্রাণেরাই চরিত্র। নাচে তাদের মাধ্যমেই আমরা আগুন থেকে জঙ্গলকে রক্ষা করার বার্তা দিচ্ছি।’

    ঝালদার মাঠারি-খামার অঞ্চলের বড়পুহড়া গ্রামের ছৌ দল মহিষাসুরমর্দিনী পালার মধ্যে দিয়ে জঙ্গলরক্ষার বার্তা দিচ্ছে। দুর্গা, গণেশ, কার্তিক–সহ পালার নানা চরিত্রের মাধ্যমে জঙ্গলরক্ষার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। শিল্পী কংগ্রেস সিং মুন্ডা বলেন, ‘জঙ্গলই তো আমাদের সব। জঙ্গল ঘিরেই আমরা বেঁচে আছি। জঙ্গলে আগুন লাগলে গাছ–গাছালি বা পশুপাখিদের সঙ্গে আমরাও তো বিপন্ন হয়ে পড়ব। তাই জঙ্গলকে রক্ষা করতেই হবে। পালায় সে কথাই তুলে ধরা হচ্ছে।’

    আগুন নিয়ন্ত্রণে ছৌ নাচের ব্যবহারের সঙ্গে আরও কিছু পদ্ধতি চালু করতে চলেছে বন দপ্তর। আগুনের উৎস সন্ধানে ড্রোন ওড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন ডিএফও। তিনি বলেন, ‘ড্রোন উড়িয়ে আগুন খোঁজা হবে। এতে দ্রুত আগুন নজরে আসবে। পাশাপাশি মাঠা, শিরকাবাদ, খামার সমেত পাহাড়ে ওঠার রাস্তাগুলিতে নাকা চেকপোস্ট বসানো হবে। পর্যটকদের কাছে আমাদের অনুরোধ, এ সময়ে পাহাড়ে গেলে ধূমপান থেকে বিরত থাকুন। ধূমপানজনিত অসতর্কতা থেকেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।’

  • Link to this news (এই সময়)