সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ২৫ হাজার ৭৫৩ জন চাকরি বাতিলের রায়ের পর নিজের ক্ষোভ উগরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন নবান্নে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর সঙ্গে বৈঠকের পর একটি সাংবাদিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আজ সুপ্রিম কোর্টের রায় আমরা বিস্তারিত পড়েছি। রায়টি আমরা পুরোটা পড়েছি। বিচার ব্যবস্থার প্রতি আমাদের পূর্ণ সম্মান রয়েছে। কোনও বিচারপতির বিরুদ্ধে আমাদের কোনও অভিযোগ নেই।’
তবে এই বৈঠকে চাকরি বাতিলের পিছনে বিজেপি-কে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। কেন্দ্রকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন,’এই বিচার মেনে নিতে পারছি না। আমি মনে করি বিজেপি এটা করিয়েছে। বিজেপি এবং কেন্দ্রের টার্গেট আমরা বুঝি। এসএসসি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। একজনের অপরাধে কতজনের শাস্তি হয়?’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপর্যয় আনা কি বিজেপি সরকারের টার্গেট?’ তিনি এই চাকরি বাতিলের পিছনে সুকান্ত এবং বিকাশকেও নিশানা করেন। সিপিএম নেতা এবং আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে টার্গেট করে মমতা মন্তব্য করেন, ‘বিকাশবাবু পৃথিবীর বৃহত্তম আইনজীবী। কেন বিকাশকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হচ্ছে না?’ বাম আমলে চাকরি নিয়ে দুর্নীতির প্রসঙ্গও তুলেছেন মমতা। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘সিপিএম জমানায় চিরকুটে চাকরি হতো।’
রাজ্যের ২৫ হাজার ৫৭৩ জন শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর চাকরি যাওয়ার পর তাঁদের মানসিক অবস্থা ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২৫ হাজার চাকরি যাওয়া মানে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েক হাজার পরিবার। অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হবে কয়েক লক্ষ মানুষ। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘কিছু একটা হয়ে গেলে দায় কে নেবে? সিপিএম, বিজেপি কারও চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নেই। শুধু মিথ্যাচার, বাংলায় জন্মানো কি অপরাধ? পারলে আমাকে ধরুন।’
অন্যদিকে চাকরি হারা মানুষের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন মুখ্যমন্ত্রী মানবিকভাবে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। সাংবাদিক বৈঠকের আগে এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর সঙ্গে আলোচনাও সেরেছেন তিনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এতগুলো শিক্ষকের চাকরি চলে গেলে স্কুলগুলির অবস্থা কী হবে? বলেন, ‘এত চাকরি বাতিলে স্কুল চলবে কী করে? এজন্য রাজ্যের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আশ্বস্ত করে মমতা বলেন, এই মামলার জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। আমরা তিন মাসের মধ্যে নিয়োগ করে দেব।’
সেই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, ‘যাদের চাকরি গিয়েছে, তারা বিচার পাওয়ার জন্য ডিপ্রাইভড টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করেছেন। আমি শুনেছি শিক্ষক-শিক্ষিকারা অনেকে ডিপ্রেসড। ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছেন অনেকে। আমরা চাই না একটাও দুর্ঘটনা ঘটুক। তাই পরিবারগুলির পাশে দাঁড়িয়েছি মানবিকতার স্বার্থে। তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন, সবাই একত্রিত হতে চান। তাঁরা অনুরোধ করেছেন, শিক্ষামন্ত্রী-সহ আমি যদি তাঁদের সভায় উপস্থিত থাকি, তাঁরা খুশি হবেন।’ আগামী ৭ এপ্রিল নেতাজি ইন্ডোরে সেই সভায় উপস্থিত থেকে মুখ্যমন্ত্রী চাকরিহারাদের কথা শুনবেন। তিনি বলেছেন, ‘ধৈর্য হারাবেন না। মানসিক চাপ নেবেন না। যখন প্রক্রিয়া হবে, আদালত তো আপনাদের সকলকে আবেদন করতে বলেছে। আপনারা আবেদন করুন।’
মুখ্যমন্ত্রী এই ঐতিহাসিক চাকরি বাতিলের রায় প্রসঙ্গে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিকেও তুলোধোনা করতে ছাড়েননি। এইসব রাজ্যের একের পর দুর্নীতি এবং তার বিরুদ্ধে সরকার ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘বিজেপি শাসিত রাজ্যে তদন্ত হয় না। মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম কাণ্ডে কী হয়েছে? কতজনের শাস্তি হয়েছে?’ তিনি আরও একধাপ এগিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত প্রশ্ন, একজন বিচারপতির বাড়ি থেকে কত কোটি টাকা পাওয়া যায়, তার শাস্তি শুধু বদলি!’