সৌমেন রায় চৌধুরী
বাংলায় চালু প্রবাদ মামাভাগ্নে যেখানে, বিপদ নেই সেখানে। কিন্তু বাংলার এই প্রবাদ হোঁচট খেল বৃহস্পতিবার, তাও আবার বাংলারই বুকে। সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে, মুহূর্তের মধ্যে বিপদের আঁধার ঘনিয়ে এল উত্তর ২৪ পরগনার বাগদার মামাভাগ্নে গ্রামে। কেন?
কারও চোখ আটকে ছিল টিভির পর্দায়। কারও চোখ হাতের ধরা মোবাইলে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল গোটা গ্রাম। প্রতি মিনিটে যেন রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। বৃহস্পতিবার সকালে যখন দেশের শীর্ষ আদালত ২৬ হাজার শিক্ষকের গোটা প্যানেল বাতিলের নির্দেশ দিল, তখন এই গ্রামে যেন পিন পতনেরও শব্দ শোনা যাবে।
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় একেবারে প্রথমেই উঠে এসেছিল একটি নাম- সৎ রঞ্জন। টাকার বিনিময়ে বেআইনি ভাবে নিয়োগের যে চক্র কাজ করেছিল, তার অন্যতম আড়কাঠি ছিল এই সৎ রঞ্জন। যার আসল নাম চন্দন মণ্ডল। সে এই মামাভাগ্নে গ্রামেরই বাসিন্দা। সরকারি চাকরি পাওয়ার আশায় কেউ জমি-জমা বিক্রি করে, কেউ আবার সব সঞ্চয় ভাঙিয়ে এই চন্দনের হাতেই তুলে দিয়েছিল টাকা। তার বদলে পেয়েছিল স্কুল শিক্ষকের চাকরি। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ধাক্কায় চাকরি হাতছাড়া যেমন হলো, তার সঙ্গেই গেল টাকাও।
সৎ রঞ্জন ওরফে চন্দন মণ্ডলের হাত ধরে বাগদা ব্লকের মামাভাগ্নে গ্রামে বেআইনি ভাবে বহু লোক শিক্ষকের চাকরি পেয়েছিলেন। বহু বাসিন্দা স্কুলের চাকরি করেন বলে, এই এলাকা ‘মাস্টার পাড়া’ নামেও পরিচিত। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় আগেই গ্রেপ্তার হয়েছে চন্দন। তার বিরুদ্ধে বাগদার মামা ভাগ্নে এলাকা সহ আশপাশের এলাকার বহু মানুষকে টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হাইকোর্টে মামলা চলাকালীন চাকরি বাতিলের তালিকায় এই গ্রামের প্রায় শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নাম দেখা গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টে মামলা যাওয়ায়, কিছু আশা দেখেছিলেন তাঁরা। কিন্তু বৃহস্পতিবারের রায় সেই আশাতেও জল ঢেলেছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায় শোনার পর থেকে বাগদার মামাভাগ্নে গ্রামে নাকি হাঁড়ি চড়েনি। চাকরি গিয়েছে ওই গ্রামের মিঠুন বিশ্বাস, ভীম মণ্ডল-সহ বহু ব্যক্তির। তাঁরা কেউ নামখানায়, কেউ গঙ্গাসাগরে চাকরি করছিলেন। কেউ ছিলেন শিক্ষক, কেউ আবার শিক্ষাকর্মী। চাকরি যাওয়া পরিবারের সদস্যদের অনেকেই জানিয়েছেন, চন্দন মণ্ডলকে টাকা দিয়েই চাকরি হয়েছিল। সূত্রের খবর, ওই এলাকায় ১০০-রও বেশি যুবককে চাকরি দিয়েছিল চন্দন। এক একজনের চাকরির জন্য ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ টাকা নিয়েছিল। সরকারি চাকরির আশায় জমি বিক্রি করে, ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে সেই টাকা দিয়েছিলেন অনেকে। এখন তাঁদের কী হবে? সেই প্রশ্ন তুলছেন চাকরি-হারা পরিবারের সদস্যরা। চাকরি যাওয়া এক ব্যক্তি স্ত্রী শম্পা বিশ্বাসের আক্ষেপ, ‘সংসার কী ভাবে চলবে জানি না...’, তাঁদের এক সন্তান চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন ওই মহিলা। স্থানীয় এক বাসিন্দার ছেলেরও চাকরি গিয়েছে, তাঁর ক্ষোভ, ‘দেড় বিঘা জমি বেচে টাকা দিয়েছিলাম। এখানে অনেকেই দিয়েছিল টাকা।’ চাকরি গিয়েছে, জমিও গিয়েছে। তাই এখন পথে বসার আশঙ্কায় কাঁটা মামাভাগ্নে গ্রামের শতাধিক পরিবার।
যদিও চাকরিহারাদের একাংশের দাবি, তাঁরা পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়ে বৈধভাবেই চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সব বাছবিচার না হয়ে পুরো প্যানেল বাতিলের নির্দেশ দেওয়ায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে তাঁদের।