সুপ্রিম কোর্টে ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের চাঞ্চল্যকর রায়ের পরেই চাকরিহারাদের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়ে গিয়েছে। হতাশায় ডুবে রয়েছেন অনেকে। বিশেষ করে যাঁরা টাকার বিনিময়ে চাকরি পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের অবস্থা আরও করুণ। কারণ একদিকে যেমন তাঁদের চাকরি গেল, তেমনি অন্যদিকে তাঁদের টাকাও গেল। কাজ হারিয়ে অন্ন সংস্থানের পথও বন্ধ হয়ে গেল। এভাবে পরিবার নিয়ে ধনে মানে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তাঁদের এখন কান্না ছাড়া আর কোনও গতি নেই। কীভাবে সংসার চলবে? কীভাবে মিটবে ঋণ? কীভাবে অবিবাহিত বোনের বিয়ে দেবেন? ভেবে কুল কিনারা করতে পারছেন না।
তবে অনেকে এখনও হাল ছেড়ে দিতে রাজি নন। এই রায় মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না তাঁরা, বিশেষ করে যাঁরা যোগ্য হয়েও চাকরি হারিয়েছেন, তাঁরা পাল্টা লড়াইয়ের পথে হাঁটতে চাইছেন। চাকরিহারা পশ্চিম মেদিনীপুরের তরিয়া হাইস্কুলের ভূগোলের শিক্ষক কৃষ্ণেন্দু দত্তের কথায়, ‘বাড়িতে অবিবাহিতা বোন রয়েছে। বয়স্ক বাবা-মা রয়েছে। কীভাবে বোনের বিয়ে দেব জানি না। নিজেরও বিয়ে করা হয়নি।’ তবে লড়াই চলবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টে যেখানে যোগ্য-অযোগ্য আলাদা করা গেল, কেন তখন সকলের চাকরি গেল, সেটাই তো বুঝতে পারলাম না।’
আর এক চাকরিহারা হালিশহর আদর্শ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডল বলেন, আদালতের রায় অসহায়তার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। আর কিছু হারানোর থাকল না। কিন্তু অনেকেই ফোন করে বলছে, বাঁচতে পারব না। মৃত্যু বেছে নিতে হবে। কিন্তু তাঁদের বলব, নিজের ক্ষতি করে কিছু করা যায় না। বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটতে হবে। তবে বিচারব্যবস্থার উপর থেকে বিশ্বাস চলে গেল। এর শেষ দেখে ছাড়ব।
যদিও চিন্ময় বাবুর মতো সবাই এতটা মনের জোর রাখতে পারছেন না। সদ্য চাকরিহারা প্রতাপ রায়চৌধুরী নামে জনৈক শিক্ষক বলেন, এরপর মৃত্যুই পথ। আর কিছু রইল না।
পোলবায় আর এক চাকরি হারা দিনমজুরের ছেলে জিতেন টুডু। তাঁর বাবা-মা দুজনেই দিনমজুর হলেও ছেলে চাকরি পাওয়ায় পরিবারে কিছুটা হলেও স্বচ্ছলতা এসেছিল। চাকরি বাতিলের খবরে জ্বলে ওঠা আশার প্রদীপ আচমকা নিভে গেল। জিতেন পোলবার সুগন্ধা গ্রাম পঞ্চায়েতের কামদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি হারিট হাইস্কুলে গ্রুপ ‘ডি’ পিয়ন পদে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল। বৃহস্পতিবার স্কুলে কাজ করতে করতেই শুনলেন তাঁর চাকরিটা আর নেই। মাথায় যেন বজ্রাঘাত পড়ল। এদিনের রায় শুনে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অগত্যা স্কুলের শিক্ষকরা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসেন।
এদিন জিতেন বলেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আজ সাড়ে দশটায় রায় ছিল। রায় শুনে আর কিছু বলার অবস্থায় নেই। সরকার চাইলে সবই করতে পারত। এসএসসির কাছে নথি নেই? সবই আছে। আমাদের কাছে সমস্ত কিছু ডকুমেন্টস আছে। মা বাবা মাঠে কাজ করে। আমাদের টাকা দেওয়ার কোনও ক্ষমতা ছিল না। আমাদের কোন সোর্সও ছিল না যে কাউকে হাতে-পায়ে ধরে চাকরি চাইব। ভেবেছিলাম যাঁরা যোগ্য, তাঁদের চাকরি থাকবে। আগামী দিনে কী হবে কিছুই জানি না।’