সেনাবাহিনীতে অসম সাহসিকতা ও কৃতিত্বের জেরে ঘরের ছেলে রিয়াজকে ঘিরে উৎসব শুরু হয়েছে পুরুলিয়ায়। একসময় সংসদ ভবনে জঙ্গি হামলায় বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিলেন এই সেনা জওয়ান। তিনি পৃথিবীর উচ্চতম রণক্ষেত্র সিয়াচেন গ্লেসিয়ারে অপারেশন মেঘদূতের কৃতিত্ব অর্জন, জম্মু ও কাশ্মীরের একাধিক কাউন্টার ইনসার্জেন্সিতে শত্রুপক্ষকে জবাব, এছাড়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছেন রাজস্থানের মতো উষ্ণ রণক্ষেত্রেও। এভাবে গত ২৪ বছর ধরে দেশের সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে অবশেষে অবসর গ্রহণ করলেন আর্মি জুনিয়র কমিশন অফিসার রিয়াজ আনসারি। দেশের বীর জওয়ানের এই কৃতিত্বে গর্বিত পুরুলিয়ার বলরামপুরের বাসিন্দারা। অবসরের পর তাঁকে ঘিরে রীতিমতো উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছে এলাকায়।
অবসর গ্রহণের পর বুধবার তিনি বাড়ি ফিরেছেন। এদিন সকাল ৯টা নাগাদ পুরী-নিউ দিল্লি পুরুষোত্তম এক্সপ্রেস থেকে তিনি বলরামপুর স্টেশনে নামেন। এরপর তাঁকে ঘিরে এলাকার মানুষজন আবেগ আর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন। এলাকার মানুষজন তাঁকে গলায় মালা পরিয়ে সংবর্ধনা জানান। রীতিমতো জাতীয় পতাকা ওড়ানো একটি সুসজ্জিত গাড়িতে চাপিয়ে তাঁকে বলরামপুর বাজার পরিক্রমা করান এলাকাবাসী। এই উদ্যোগের পিছনে ছিল এলাকারই একটি ক্লাব। তাঁকে ঘিরে জনতার ভিড় ও উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি যেন একজন সেলিব্রিটি, তাঁকে করমর্দন করা ও নিজস্বী তোলার হুড়োহুড়ি লেগে যায়। এই সম্বর্ধনায় গর্বিত ও আনন্দিত অবসরপ্রাপ্ত ওই সেনা কর্মী। রিয়াজ আনসারি জানান, এভাবে যে সংবর্ধিত হব তা ভাবতেও পারেন নি। ভীষণ ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে জীবনে সত্যিই কিছু মহৎ কাজ করে বাড়িতে এসেছি।
কৃতিত্বের সঙ্গে সেনাবাহিনীর গুরু দায়িত্বের পুরো মেয়াদ সম্পন্ন করে ফিরে আসায় রীতিমতো আবেগে ভাসছেন এলাকার মানুষজন। স্থানীয় বাসিন্দা বিজয় কুমার সাউ জানিয়েছেন, আগামী দিনে তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে আদর্শ হয়ে উঠবেন। পড়শি গুলাবসা খাতুন থেকে প্রাক্তন সেনানির ভাইঝি রেশমি খাতুন বলছেন, দেশের সেবা করে সুস্থভাবে তিনি গ্রামে ফিরে এসেছেন। তাঁকে ঘিরে সবাই গর্বিত।
জানা গিয়েছে, বলরামপুর মসজিদ পাড়ার বাসিন্দা রিয়াজ ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। আর ওই বছরের শেষের দিকে দিল্লির সংসদ ভবনে জঙ্গি হামলা হয়। সেই হামলা প্রতিহত করতে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করেন। এরপর ২০০২ থেকে ২০০৩- প্রায় এক বছর প্যারেন্ট রেজিমেন্ট ইন্ডিয়ান আর্মি আর্টিলারি সেন্টার নাসিকের ময়দানি তোপখানায় কর্মরত ছিলেন। তারপর জম্মু ও কাশ্মীরের গুরুত্বপূর্ণ লাইন অফ কন্ট্রোলের মতো এলাকায় নজরদারির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। রিয়াজ ভারতীয় সেনার অন্যতম কমান্ডো বাহিনী, রাষ্ট্রীয় রাইফেলেও যোগদান করেন। এভাবে একবার নয়, দু-দুবার কমান্ডো বাহিনীতে যোগদান করে দেশের সেবায় নিয়োজিত হয়েছিলেন। সে সময় জম্মু-কাশ্মীরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি অপারেশনে অংশ গ্রহণ করেন।
এছাড়া পৃথিবীর উচ্চতম রণক্ষেত্র সিয়াচেন গ্লেসিয়ারে অপারেশন মেঘদূত থেকে রাজস্থানের মতো উষ্ণ রণক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে অংশগ্রহণ করে সাফল্য দেখানোর জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁকে একাধিক মেডেল ও সম্মানে ভূষিত করেছে। সবশেষে সম্প্রতি তিনি তোপখানা নাসিক রোড ক্যাম্প ইন্সট্রাক্টর পদ থেকে অবসরগ্রহণ করেছেন।
এতদিন দেশের জন্য নিজের জীবন-যৌবন সঁপে দিয়েছিলেন। এবার বাড়ি এসে খুবই খুশি মেজাজ। যে ক্লাব তাঁকে এভাবে সংবর্ধনা জানাল, তিনি নিজে আবার সেই ক্লাবের মেন্টর। তাঁর হাতে শারীরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে বলরামপুরের অনেকেই বর্তমানে প্রতিরক্ষা বিভাগে চাকরি করছেন। রিয়াজ জানান, তাঁর স্বপ্ন আগামী দিনে সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে আগ্রহী তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। আগামিদিনে যাঁরা দেশসেবার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে চান, তাঁদের পাশে সব সময় থাকতে চান তিনি।