• শেষ দেখায় মানবিকতা ডিঙোচ্ছে সীমান্ত-বেড়া
    এই সময় | ১৮ মে ২০২২
  • চিত্রদীপ চক্রবর্তী: প্রিয়জনকে শেষ দর্শন। এতদিন ধরে তাতে বাধা তুলে দাঁড়িয়েছিল সীমান্তের বেড়া। কিন্তু মানবিকতা আর কবে, কোথায় আইনের বই হুবহু মেনে চলেছে? তাই রক্তের সম্পর্ককে সম্মান জানাতে উদ্যোগী হয়েছে বিএসএফ। তাঁদের সৌজন্যে বাবা-মা কিংবা ভাইকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাচ্ছেন ছেলে-মেয়ে এবং বোনেরা।

    গত তিন মাসে মোট ছ'টি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের মানবিক দিক তুলে ধরেছে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী।

    ঘটনা ১: ২৮ ফেব্রুয়ারি নদিয়ার মুরুটিয়া গ্রামের সরিফুল মণ্ডল স্থানীয় ৫৪ নম্বর ব্যাটেলিয়নের কমান্ডারের কাছে গিয়ে জানান, তাঁর মা খাদিজা মণ্ডল মারা গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর তিন বোন ওপারে বাংলাদেশে থাকেন। ফলে বোনেদের যদি শেষ দর্শন করার সুযোগ দেওয়া হয় তবে তাঁরা কৃতজ্ঞ থাকবেন। বিএসএফের অধিকারিক উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের কর্তাদের সঙ্গে। দুপক্ষের আলোচনার পরে তিন বোনকে আনা হয় জিরো পয়েন্টে। সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় মৃতদেহ। মাকে শেষ দর্শন করেন মেয়েরা।

    ঘটনা ২: এপ্রিল মাসের ৩ তারিখ ওই একই গ্রামের বাসিন্দা সুকুর মণ্ডল বিএসএফ ক্যাম্পে গিয়ে নিজের মা রোহতন বিবির মৃত্যুর খবর জানানোর পাশাপাশি নিজের দুই বোনকে একবার মায়ের শেষ দর্শন করানোর অনুরোধ করেন। আগের মতোই বিএসএফের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় বিজিবি-র সঙ্গে। সীমান্ত লাগোয়া জমিতে রাখা হয় রোহতন বিবির দেহ। বাংলাদেশে বসবাসকারী দুই মেয়ে মায়ের মৃতদেহ দেখতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে ফিরে যাওয়ার আগে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বিএসএফের প্রতি।

    ঘটনা ৩: নদিয়ার বাঁশঘাটার স্কুল শিক্ষক জুলফিকার আলি মণ্ডল গত ১৬ এপ্রিল আচমকা মারা যান। তাঁর তিন বোন খাইরান মণ্ডল, ফিরদৌসি মণ্ডল এবং খোদেজা মণ্ডল বাস করেন বাংলাদেশের যশোর জেলার বাহাদুরপাড়া গ্রামে। মৃত শিক্ষকের ভাই মেহতাব মণ্ডল ১০৭ ব্যাটেলিয়নের ক্যাম্পে গিয়ে আবেদন করেন বিএসএফ উদ্যোগ নিলে বোনেরা মৃত দাদাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাবেন। মানবিকতায় সাড়া দিয়ে বিএসএফ উদ্যোগে প্রায় ২ কিলোমিটার দূর থেকে বোনেদের রাত সোয়া এগারোটায় নিয়ে আসা হয় দুই দেশের সীমান্তে। সেখানেই শেষ বারের মতো দাদাকে দর্শন করেন তাঁরা।

    ঘটনা ৪: চলতি মাসের ৫ তারিখ মুরুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা নমাজ মণ্ডল এসে বিএসএফ কমান্ডান্টকে বলেন, রাত দশটা নাগাদ বাবা ইলিয়া মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের চুয়াডাঙার মাধবখালি গ্রামের বাসিন্দা তাঁর বোন সাহিরা বিবি, কাকা সিরাজুল মণ্ডলকে খবর পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি শেষ দর্শন করাতে চান। সেই ইচ্ছের মর্যাদা দিতে সীমান্তের প্রায় দু'কিমি ভিতরে থাকা গ্রাম থেকে তাঁদের ডেকে নিয়ে আসা হয় বিজিবির সাহায্য নিয়ে। শেষবারের মতো বাবাকে দেখে মেয়ে ফিরে যেতেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় বৃদ্ধ ইলিয়ার।

    ঘটনা ৫: নদিয়ার হাটখোলার বাসবাস করেন নিওথালি হালসানা। তিনি ৮২ নম্বর ব্যাটেলিয়নে এসে খবর দেন গত ৭ মে তাঁর মা আনওয়ারা হালসানা রাত ৯টায় মারা গিয়েছেন। তাঁর দুই বোন ডালিয়া বিবি আর ওমেহার বিবি বাংলাদেশের কুতুবপুরে থাকেন। বিএসএফ উদ্যোগ নিলে তাঁরা মাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাবেন। এই অনুরোধের পরে বিজিবির সঙ্গে আলোচনা করে পরের দিন রাতে জিরো পয়েন্টে দু'জনকে ডেকে আনা হয়। মেয়েরা শেষবার দেখার পরে মাকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্তিম কাজের জন্য।

    Nadia Nakashipara: প্রধানের টেবিলে রাখা বিলিতি মদ-মাংস, মাঝরাতে পঞ্চায়েত অফিসে 'মোচ্ছব'! তুঙ্গে বিতর্ক

    ঘটনা ৬: গত ১৪ তারিখ মালদহের কেষ্টপুরে মৃত্যু হয় আব্দুল খালেকের। স্থানীয় ৪৪ নম্বর ব্যাটেলিয়নে গিয়ে গ্রামের মোড়ল জানান খালেকের বোন বাংলাদেশের চাপাইনবাবগঞ্জের চাঁদশিকারী গ্রামে থকেন। বিএসএফের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিলে বোন শেষবারের মতো দাদাকে দেখার সুযোগ পেতে পারে। বিজিবির সঙ্গে কথা বলে সেই ইচ্ছে পূরণের সুযোগ করে দেওয়া হয় বোনকে।

    বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ শাখার ডিআইজি সুরজিৎ সিং গুলেরিয়ার কথায়, 'আমরা শুধু যে সীমান্তে পাহারা দিই তা নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এই কাজটা করাও আমাদের সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ভবিষ্যতেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হবে।'
  • Link to this news (এই সময়)