• চাকরি খুইয়ে মাথা ঠুকছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা, উদ্বেগ
    বর্তমান | ০৪ এপ্রিল ২০২৫
  • সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: কথায় বলে, ‘মুড়ি-মুড়কির একদর।’ এই প্রবাদ বাক্যটি যে শেষ পর্যন্ত পরিবারে বিপর্যয় ডেকে আনবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কাটোয়ার একটি স্কুলের শিক্ষক! 

    বুধবার ওই শিক্ষকের স্ত্রীর কোল আলো করে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। গোটা পরিবার খুশিতে টগমগ। স্রেফ একটা রাতের ব্যবধানে উধাও সেই আনন্দ-উল্লাস। হাইকোর্টের রায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত বহাল রাখতেই চাকরিহারা ওই শিক্ষক। আতান্তরে গোটা পরিবার। বৃহস্পতিবার চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলছিলেন, ‘নিজের যোগ্যতাতেই চাকরি পেয়েছিলাম। এভাবে চাকরি কেড়ে নেবে আমি ভাবতেই পারছি না! আমার সদ্যোজাতের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হল। এখন সংসার চালাবে কিভাবে, বুঝে উঠতে পারছি না। এতজনের মুখের ভাত কেড়ে নেওয়ার আগে ভাবনাচিন্তা করা উচিত ছিল।’

    সদ্য বিয়ে করেছেন মঙ্গলকোট এলাকার এক শিক্ষক। তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল, দস্তুরমতো পড়াশোনা করে চাকরি পেয়েছেন। কেড়ে নেওয়ার সাধ্যি কারও নেই। কিন্তু সুপ্রিম রায় সেই আত্মবিশ্বাস ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। কথা বলার অবস্থাতে তিনি নেই। তাঁর এক আত্মীয়ের কথায়, ‘এতদিন চাকরি করার পর ওঁর সামাজিক সম্মান তৈরি হয়েছিল। সম্প্রতি বিয়েও করেছিলেন। এক রায়ে সব বদলে গেল। টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়ার মতো ওঁর আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন। এভাবে সবার চাকরি বাতিল করে দেওয়া অমানবিক।’ 

    কাটোয়া কিংবা মঙ্গলকোটের দুই শিক্ষক উদাহরণ মাত্র। তাঁদের মতো অনেক যোগ্য শিক্ষকই চাকরিহারা হয়েছেন। শিক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, জামালপুর, গলসি সহ বিভিন্ন স্কুলেই বহু শিক্ষক শিক্ষিকার চাকরি বাতিল হয়ে গিয়েছে। তাঁদের অনেকে এদিনও ক্লাসে এসেছিলেন। সেই সময় তাঁদের কাছে রায়ের খবর আসে। মেমারির একটি স্কুলের দু’জন শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়ে গিয়েছে। এই স্কুলে শোকের ছায়া নেমে আসে। ওই দুই শিক্ষক সঙ্গে সঙ্গেই স্কুল ছেড়ে বেরিয়ে যান। পূর্ব বর্ধমান জেলাপরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ শান্তনু কোনার বলেন, ‘বহু স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকার সমস্যা রয়েছে। কিভাবে পঠনপাঠন হবে, তা নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছে। নিজের যোগ্যতায় চাকরি পাওয়ার পরও অনেকে কাজ হারিয়েছেন। তাঁদের আয়েই সংসার চলত। কেন্দ্র ওষুধের দাম বাড়িয়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও অগ্নিমূল্য। এই অবস্থায় ওই পরিবারগুলির সংসার চলবে কিভাবে, সেটা ভাবার দরকার ছিল।’ 

    তৃণমূল নেতা দেবু টুডু বলেন, ‘বিজেপির চক্রান্তেই এতজনকে চাকরি হারাতে হল। বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ ওরা অনিশ্চিত করে দিয়েছে।’ পাল্টা দিয়েছেন বিজেপির জেলা সভাপতি অভিজিৎ তা। তিনি বলেন, ‘এতজনের চাকরি যাওয়ার পিছনে তৃণমূলই দায়ী। ওরা দুর্নীতি না করলে এতজনের চাকরি যেত না।’ শিক্ষাদপ্তর সূত্রে খবর, অনেকেই অন্যান্য দিনের মতো এদিনও স্কুলে এসেছিলেন। ক্লাসও নিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের রায় শোনার পরই বদলে যায় পুরো পরিবেশ। কান্নায় ভেঙে পড়ে তাঁরা বাড়ি চলে যান। 

    মুড়ি-মুড়কির একদরের অভিঘাতে আর্তনাদ জেলার সর্বত্র।
  • Link to this news (বর্তমান)