• পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের মাশুল কাদের?
    আজকাল | ২৯ আগস্ট ২০২৫
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক:  ২০২৩ সালের জোশীমঠ ও সিকিমের চুংথাং বিপর্যয়ের পর ফের একবার ভয়াবহ দুর্যোগে কাঁপল উত্তরাখণ্ডের গঙ্গোত্রী উপত্যকা। সোমবার, ৫ অগস্ট, হরশিল উপত্যকার সবথেকে উঁচু গ্রাম থারালি তছনছ হয়ে গেল আকস্মিক বন্যায়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি হয় গ্লেসিয়ার লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF), নয়তো মেঘভাঙা বৃষ্টি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের বিপর্যয়ের আসল কারণ পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন, অযৌক্তিক বাঁধ নির্মাণ, লাগামছাড়া পর্যটন প্রকল্প এবং অবৈজ্ঞানিক সড়ক সম্প্রসারণ।

    থারালি গ্রামে সর্বনাশ ডেকে আনে খীর গাদ। এই নদী ইতিমধ্যেই তৃতীয়বার প্লাবিত হলো। ২০২৩ সালেই ভূতত্ত্ববিদ ড. নবীন জুয়াল সতর্ক করেছিলেন—দ্রুত বরফ গলার কারণে ভবিষ্যতে এই উপত্যকায় বড়সড় বিপর্যয় আসবেই। অথচ সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে নদীতীরে পর্যটন-নির্ভর নির্মাণ হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, যদি জলান্দ্রি গাদ বা কাকোড গাদে প্রস্তাবিত বাঁধ তৈরি হতো, তবে ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বাড়ত। ইতিমধ্যেই লোহারিনাগ বাঁধের কোটি কোটি টাকার সুড়ঙ্গ ভেসে গেছে। যদি পলা বাঁধও তৈরি হতো, তবে এক “মেগা-ডিজাস্টার” ঘটত। অথচ এসব প্রকল্পের সঠিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন হয়নি।

    চারধাম প্রকল্পের নামে সীমান্ত সড়ক সংস্থা (BRO) উত্তরকাশী থেকে গঙ্গোত্রী পর্যন্ত রাস্তা দ্বিগুণ করতে গিয়ে কোনো পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (EIA) বা ছাড়পত্র নেয়নি। এর ফলে তক্ষ্ণৌর অঞ্চলের সাতটি গ্রামের অস্তিত্বই আজ সংকটে। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, “কাটিং” পদ্ধতিতে পাহাড় কেটে রাস্তা বানানোয় প্রতি ১০ কিমিতে একেকটি ভূমিধস হচ্ছে। শুধু চারধাম সড়কেই তৈরি হয়েছে ৮১১টি ভূমিধসপ্রবণ এলাকা। ঐতিহ্যবাহী পদযাত্রার বদলে এখন চারধামে চলছে হেলিকপ্টারের ভিড়। দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় কিছুদিন উড়ান বন্ধ হলেও ফের শুরু হওয়ার তোড়জোড় চলছে। কেদারনাথ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে সড়ক নির্মাণ, রাতারাতি আবাসন, মাণ্ডাকিনীতে দূষণ—সব মিলিয়ে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ ও বিলুপ্তির পথে ব্রহ্মকমলের মতো বিরল উদ্ভিদ।

    ভারতের হিমালয়ে প্রায় ১০ হাজার হিমবাহ প্রতি দশকে ১০০-২০০ ফুট হারে গলছে। এর ফলে অজস্র হ্রদ তৈরি হচ্ছে, যা হঠাৎ ভেঙে গিয়ে ভয়াবহ বন্যা ডেকে আনছে। ২০২১ সালের তপোবন দুর্ঘটনা ও ২০২৩ সালের জোশীমঠ ধস এর উদাহরণ। অথচ এসব শিক্ষা গ্রহণ না করে আরও ৭৫টি সুড়ঙ্গ নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—হিমালয়ের নাজুক পরিবেশে আর কোনো নতুন বাঁধ বা বৃহৎ পরিকাঠামো তৈরি করা যাবে না। পর্যটনের বহনক্ষমতা নির্ধারণ, বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়া সড়ক সম্প্রসারণ বন্ধ, এবং প্রকল্প অনুমোদনে প্রকৃত জনশুনানি আবশ্যক।

    হিমালয়ের বিপর্যয় আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং ধারাবাহিক এক মানবসৃষ্ট সংকটের ফল। অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ, অগোছালো পর্যটন পরিকাঠামো, বন উজাড় এবং পাহাড় কেটে রাস্তাঘাট তৈরির মতো কাজ পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। এর ফলে ভূমিধস, হঠাৎ বন্যা, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, এমনকি পুরো গ্রাম ভেসে যাওয়ার মতো ভয়াবহ দৃশ্য আজ প্রায় প্রতি মৌসুমেই দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতিতে এত বেশি চাপ সৃষ্টি হলে এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। তবু রাষ্ট্র ও কর্পোরেট স্বার্থের কাছে পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। এখনই যদি পরিকল্পনা নেওয়া না হয়, তবে এই বিপর্যয় স্থায়ী সংকটে রূপ নেবে।
  • Link to this news (আজকাল)