• বীরেন্দ্রকৃষ্ণে মুগ্ধ বাঙালির উত্তর প্রজন্ম ভুলেছে মহালয়ার টান?
    বর্তমান | ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • দেবরাজ রায়চৌধুরী 

    মহালয়ার সঙ্গে ভোর জড়িয়ে। সঙ্গে ‘এসেছে শরৎ, হিমের পরশ’ ছন্দে শিউলির মৃদু সুবাসে ধরা আসন্ন উৎসবের আশ্বাস। কিন্তু এখন এই  প্রজন্মের কাছে ভোর কোথায়! তাদের গভীর আলাপ শুরুই তো হয় রাত বারোটা পার করে। বিকেলের মতো ভোরও উধাও তাদের মনন থেকে। ফলে মহালয়ার মায়ায় তারা জড়ায়নি, যেমনটা ছিল আমাদের আগের প্রজন্ম। খানিকটা আমরাও। তখন শহরেও শরৎ নামত। মফস্সলের আনাচে কানাচে দেখা মিলত কাশফুলের। এখন দু’মুঠো ঘাস খুঁজে পেতে ছুটতে হয় অনেক দূরে। তখন নদীর পাড়জুড়ে বর্ষার পরপরই ফুটত কাশ। মনে হতো কেউ মেলে দিয়েছে বিশাল বিশাল সাদা ধবধবে চাদর। মহালয়ার আগের রাতে চলে যেতাম নদীর পাড়ে। অলস হিমের কণাগুলো ধীর লয়ে নিঃশব্দে নেমে এসে কখন যে ভিজিয়ে দিত পুরো শরীর আর সত্ত্বা, ঠাওর করতে পারতাম না।  সে ছিল আমাদের বড়  হওয়ার রাত। কিছুটা বড় হয়েছিলাম সরস্বতী পূজোর রাতে। বাকিটা তোলা থাকতো মহালয়ার আগের রাতের জন্য। ঘোর কাটত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অলৌকিক স্তোত্র পাঠে। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের গলায় ‘জাগো দুর্গা’য় যেন জেগে উঠতে দেখতাম নদীর পাড়ের সাদা চরে নীল ভোর। বুকে একটা চাপা উত্তেজনা। সেটা কি বহু অপেক্ষার আসন্ন উৎসবের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়ার জন্যে? নাকি অন্য কিছু? ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না। এখন বুঝি সেই না বোঝার নাম ছিল কৈশোর।  

    এই প্রজন্মকে মহালয়া সেভাবে টানে না, তাদের কাছে অনেক অন্য হাতছানি। ক্লাস নাইন থেকে টুয়েলভ এর মধ্যে পড়াশোনা করছে এমন বেশকিছু শহুরে ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেমেয়েকে প্রশ্ন করেছিলাম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নাম জানে কিনা। সবাই উত্তর দিয়েছিল, না। 

    ১৯৩১ সালে পঙ্কজকুমার মল্লিকের পরিচালনায় বাণীকুমারের স্ক্রিপ্টে আকাশবাণী কলকাতার গার্স্টিন প্লেস থেকে লাইভ সম্প্রচারিত মহিষাসুরমর্দিনী কেমন সাড়া ফেলেছিল বাঙালি মনে? 

    আমার ঠাকুমা কোনও কারণে রাগ করে চলে গিয়েছিলেন তাঁর বাবার বাড়িতে। মহালয়ার আগের দিন ঠাকুরদা সেখানে লোক পাঠিয়েছিলেন  এক লাইনের অমোঘ বার্তা দিয়ে- ‘ওকে বলে দিও, আমার ছয় ব্যাটারির রেডিও’। সেবারের মহালয়াটা তাঁরা একসঙ্গেই শুনেছিলেন। সম্ভবত সেটাই শেষবার। তারপর দেশ স্বাধীনের যজ্ঞে ঠাকুরদা শুধু জেলের ভিতর আর বাহির। পরে মৃত্যু। কিন্তু সে অন্য বিষয়। বৃদ্ধা শেষদিন পর্যন্ত ভোলেননি সেই  ব্যাটারি আর রেডিওর দেমাক। আজ সেই বড় বড় ব্যাটারিও গায়েব, অবলুপ্তির পথে রেডিও। 

    দু’লাইন লেখা একটা পোস্টকার্ড সেদিনও রাখা ছিল আমাদের পুরনো ট্রাংকে।  সত্তরের আগুন ঝরা দিনে  ভগবানকে নস্যাৎ করা, ধর্মকে আফিম বলা এক নবীন যুবক চিঠি লিখেছিল তার মনের মানুষকে- আলো নেই, তেলও ফুরিয়ে আসছে, তাই তাড়াতাড়ি দু লাইন লিখছি। এখানে খুব মশা আর রেডিও জোগার হয়নি। কাল মহালয়া শোনা হবে না...!

    তখন এমনই ছিল মহালয়ার মহিমা।

    (লেখক অধ্যাপক, মালদহ পলিটেকনিক)
  • Link to this news (বর্তমান)