• মহালয়া: স্বরসঙ্গতির সন্ধানে সমতার ঐতিহ্য যেন অক্ষুন্ন থাকে
    বর্তমান | ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • শক্তিপদ পাত্র:

    মহালয়া বলতে সকলেই বলবেন দুর্গাপুজো উৎসবের সূচনা। তবে, ছোটবেলায় যখন আমার জন্মস্থান মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে ছিলাম, বিশ্বকর্মা পুজো ছিল শারদোৎসবের আগমনের ইঙ্গিত। আমাদের এলাকায় এই উৎসব উপলক্ষ্যে মেলা বসতো। তারপর গ্রামে রেডিও এল। আমার বাড়ির রেডিওটি গ্রামের দ্বিতীয়। তখন থেকে মহালয়াই হল শারদীয় আনন্দ যজ্ঞের সূচনা। কখনও কখনও ভোর হওয়ার আগের রাত জেগেই কাটাতাম। ভোর হতো ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’-র সুরে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনীতে চণ্ডীপাঠ। অর্থ বোঝার কোনও প্রয়োজন ছিল না।  আমাদের গাঁয়ে তখন পুজো-পুজো রোদ। চোখে ঝকঝকে নীল আকাশ- ছুটির সুখ-সাদা মেঘের ভেলা। খালপাড়ে কাশের বন। আমাদের অজান্তে আকাশে শুরু হত চাঁদের বড় হওয়া। গ্রামে খবরের কাগজ আসত না। তাই বিজ্ঞাপনের ঢাক না বাজলেও রেডিও মারফত পুজোর গানের খবর সবাই পেয়ে যেতেন। ওই অঞ্চলে দু-তিনটি প্রতিমার চক্ষুদান হবে। তা নিয়ে আমাদের বয়সের ছেলেমেয়েরা ছিল আনন্দে পাগল। পুজো আসছে বলে নয়, কোনও সময়েই বাড়িতে লেখাপড়ার জন্য চাপ ছিল না। তবে পুজো মানে দল বেঁধে পুজো মণ্ডপে যাওয়া হলেও, নতুন জামা পরে নয়। কারও মনে তার জন্য দুঃখ ছিল না। কারণ, বেশিরভাগের অবস্থা ছিল একই। 

    বাড়িতে বা গ্রামে কেউ মহালয়ার সময় পিতৃতর্পণ নদীতে হতো। বিশেষ করে গঙ্গার তীরে। প্রয়াত পূর্বপুরুষদের সম্মানে প্রার্থনার কথা নিয়ে আলোচনা শহুরে পরিবেশে এসে খবরের কাগজের মাধ্যমে প্রথম জেনেছি। জেনেছি মহালয়ার দিনে পিতৃপক্ষের শেষ ও দেবীপক্ষের শুরু। দেহাবসানের পরে পূর্বপুরুষদের তিন প্রজন্ম তাৎক্ষণিকভাবে স্বর্গে যান না। তাঁদের আত্মা স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যস্তরে থাকে। সেটি পিতৃলোক। মহালয়ার দিন প্রয়াত আত্মাদের মর্ত্যে অবতরণ ঘটে। বংশধরেরা নদীর তীরে আত্মাদের প্রশান্তির জন্য প্রার্থনা করেন ও নৈবেদ্য বা পিণ্ড দান করেন। জীবিতদের আশীর্বাদ করেন আত্মারা। 

    উপরোক্ত রীতি বা প্রথার কোনও যুক্তিপূর্ণ দিক পাওয়া কঠিন। নদীর জলে দাঁড়িয়ে সূর্যের উদ্দেশে তর্পণ নিয়ে ইংরেজ লেখক অল্ডাস হাক্সলি তাঁর লেখায় যুক্তিপূর্ণভাবেই এর অযৌক্তিকতা প্রমাণ করেছেন। নিশ্চয়ই এই প্রথা সংস্কার ছাড়া কিছুই না। কিন্তু কখনও কখনও ধর্ম আমাদের বাঁচতে শেখায়। বিশ্বতানের ধ্রুবপদকে নিজের জীবনগানে মিলিয়ে নিতে সাহায্য করে। আজ যখন পূর্ণতা আর ক্ষুদ্রতার টানাপোড়েনে মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন, তখন হয়তো কোনওভাবে ধর্ম মনে করিয়ে দিতে পারে বিভাজন নেই, একাকিত্ব নেই। আছে একত্ব, অখণ্ডতা। স্বরবিভাজন ত্যাগ করে সন্ধান পেতে হবে স্বরসঙ্গতির। মহালয়ার দিনে আজ আমাদের লক্ষ্য হবে নদীর ঘাটে তর্পণের মন্ত্র অর্থ বুঝে উচ্চারণ করা। সেসময় সকলে পরম ভক্তিভরে উচ্চারণ করবে সেই মন্ত্র- ওঁ যেহবান্ধবা বান্ধবা বা যেহন্যজন্মনি বান্ধবাঃ। তে তৃপ্তিমখিলাং যান্তু, যে চাস্মত্তোয়কাঙ্ক্ষিণঃ।। 

    মন্ত্রটির মূল অর্থ- যাঁরা অবান্ধব, যাঁরা বন্ধু বা অন্যজনের বন্ধু, তাঁরা যদি জল চান, তবে এই অঞ্জলিতে পরিতৃপ্ত হোন। মানুষ যেন কাউকে না ভোলে। সকলেই দায়িত্ব স্বীকার করেন। দেশের সামনে বিশেষ করে নীতি নির্ধারকদের সামনে থাকবে কেবল সহিষ্ণুতা ও গ্রহিষ্ণুতার আদর্শ নয়, থাকবে সকলের প্রয়োজনকে সমানভাবে স্বীকৃতিদানের আদর্শ। এই সমতার আদর্শ যেন কোনওভাবেই আক্রান্ত না হয়। উৎসব এভাবেই আমাদের সহায় হোক। সকলে বলব-জগতের আনন্দযজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণ। 

    (লেখক মালদহ সরকারি শিক্ষক শিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক, হর্নবি স্কলার, বঙ্গরত্ন)
  • Link to this news (বর্তমান)