• প্রতিমার বদলে ঝাড়গ্রামে প্রহরাজ রাজবাড়িতে নবপত্রিকা পুজো হয়
    বর্তমান | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: সূর্য ডোবার পর শুরু হয় দেবীর আরাধনা। গোপীবল্লভপুর-২ ব্লকের বেলিয়াবেড়া প্রহরাজ রাজবাড়িতে চারশো বছর ধরে নবপত্রিকা পুজো করা হয়। সপ্তমী থেকে দশমী প্রথা মেনে রাতে দেবীর আরাধনা হয়। চালকুমড়ো বলিও হয় রাতেই। প্রতিদিন পুজো শেষে দেবীকে পান ও ডাবের জল নিবেদন করা হয়। 

    ডুলুং নদীর তীরে রয়েছে বেলিয়াবেড়া প্রহরাজ রাজবাড়ি। এখানে প্রতিমা নয়, পুজো করা হয় নবপত্রিকাকে। ষষ্ঠীতে বেলবরণ উৎসব হয়। সপ্তমীর দিন সকালে ডুলুং নদী থেকে ঘট ভরে আনা হয়। মন্দিরে সারাদিন হোম ও চণ্ডীপাঠ চলে। সূর্য ডোবার পর শুরু হয় দেবীর আরাধনা। দেবীকে রাতে পুজো করার এই প্রথার পিছনে নির্দিষ্ট কোনও কারণ জানা যায় না। রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিমাইচাঁদ প্রহরাজ। বংশের বর্তমান সদস্যরা মনে করেন, ওড়িশার রাজা প্রতাপরুদ্রদেবের সভাসদ ছিলেন তিনি। পুজো শুরু হয় তাঁর হাত ধরেই। কথিত আছে, ভাগ্যান্বেষণে তিনি বেলিয়াবেড়া এসেছিলেন। ঝাড়গ্রামের এক মল্ল রাজার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। তারপরেই বদলে যায় তাঁর জীবন। মল্ল রাজার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকার ও স্থানীয় শাসক হওয়ার গল্প লোকমুখে ছড়িয়ে আছে। ঝাড়গ্রামের মল্ল রাজার কাছে নিমাইচাঁদ নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে পাচকের কাজ নিয়েছিলেন। রাজা তাঁর হাতের রান্না খেয়ে খুবই খুশি হয়েছিলেন। সবার খাবার পর রাজার সামনে একবার রোদের মধ্যে খেতে বসেছিলেন নিমাইচাঁদ। রাজা তাঁর কাছে ছাতা পাঠান ও তার নীচে বসে খেতে বলেন। নিমাইচাঁদ জানান, ছাতা রাখার জন্য তাঁর নিজের কোনও জায়গা নেই। রাজা তাকে বলেন, ঘোড়ায় চড়ে এক প্রহরের (তিন ঘণ্টা) মধ্যে যতটা জায়গা ঘুরে আসবেন, ততটা জায়গা তিনি স্বাধীন ভাবে ভোগ করতে পারবেন। নিমাইচাঁদ পাথরা থেকে জহরপুর পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন। ঝাড়গ্রাম রাজ এরপরেই খুশি হয়ে তাকে ‘প্রহরাজ’ উপাধি দেন। পারিবারিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এরপরেই নবপত্রিকায় দেবীর পুজো শুরু হয়। শতাব্দী ধরে আজও সেই প্রথা মেনে পুজো হয়ে চলেছে। বংশের পঁচিশতম পুরুষ বিশ্বজিৎ দাস মহাপাত্র বলেন, জিতাষ্টমীর পর আগে রাজবাড়ির মন্দির দালানে  চণ্ডীপাঠ হতো। নানা কারণে সেই প্রথা চালু রাখা যায়নি। প্রতিমার বদলে নবপত্রিকাকে এখানে পুজো করা হয়। দিনে নয়, রাতে দেবীর আরাধনা হয়। অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে সন্ধিক্ষণ মেনে চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। পুজো সম্পন্ন হওয়ার পর রাজবাড়ির কুলপুরোহিত দেবীকে পান ও ডাবের জল নিবেদন করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও পেশায় শিক্ষক সুব্রত মহাপাত্র বলেন, প্রহরাজ রাজবাড়ির দেবীর পুজো ও প্রথা একেবারেই অন্যরকম। রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু ইতিহাস। চতুর্দশ প্রহরাজ গোবিন্দরাম সৈন্যদল তৈরি করে বর্গি আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন। একবিংশ প্রহরাজ কৃষ্ণচন্দ্র সংস্কৃত ভাষায় লেখা পুঁথি  ‘দুর্গোৎসব তরঙ্গিণী’ বাংলায় অনুবাদ  করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যে যে গ্ৰন্থ আজ এক অমূল্য সম্পদ। 
  • Link to this news (বর্তমান)