রামকুমার আচার্য, আরামবাগ: এবার পুজোয় বাঙালির আশি ও নব্বই দশকের স্মৃতি উস্কে ফিরছে মাচা অর্কেস্ট্রা। সেই সঙ্গে কদর বাড়ছে কিশোর কুমার, কুমার শানু, হেমন্ত, মান্না, মানবেন্দ্র, শ্যামল বা লতা, আশা কিংবা সন্ধ্যা-আরতি কণ্ঠীদের। অনুষ্ঠানের বরাত পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই খুশি কিশোর-শানু থেকে শুরু করে এইসব স্বর্ণযুগের শিল্পীদের অনুরাগী ও কণ্ঠের ধারকরা।
মাচা অর্কেস্ট্রা বাঙালির উৎসব আঙিনার অনেক পুরনো অঙ্গ। সঙ্গীতের স্বর্ণযুগে পাড়ায় পাড়ায় জলসার আয়োজন ছিল বঙ্গ সংস্কৃতির ‘সিগনেচার’। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মহম্মদ রফি, মান্না দে, কিশোর কুমার, শ্যামল মিত্র আরও পরে কুমার শানু, অমিত কুমার, মহম্মদ আজিজ (মুন্না) অভিজিৎরা চুটিয়ে জলসা করতেন। রাতভর হতো সেই জলসা। তাঁদের কণ্ঠ অনুকরণ গ্রামীণ এলাকায় মঞ্চ মাতাতেন উঠতি শিল্পীরা। পরে অর্কেস্ট্রার জায়গা দখল করে নেয় ভিডিও প্রদর্শনী। সেটাও কালের নিয়মে হারিয়ে যায়। হাতে হাতে স্মার্টফোন। হিন্দি-বাংলা সিনেমার সমাহার। সিনেমা হলগুলির সঙ্গে হাত ধরাধরি করে সেই ভিডিও প্রদর্শনীও উধাও। তারপর, নানা কারণে অর্কেস্ট্রা করার দিকে ঝুঁকতেন না পুজো উদ্যোক্তারা। এর মধ্যেই এসে পড়ে করোনা মহামারী। প্রায় বছর তিনেক গ্রামীণ অর্কেস্ট্রা শিল্পে চলে অন্ধকার যুগ। এবার ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে আলোয় ফেরা। আর তাৎপর্যপূর্ণভাবে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে বাড়ছে মেলোডি গান শোনার প্রবণতা। সেই কারণেই পুজো উদ্যোক্তারা নতুন করে ঝুঁকছেন জলসা-কালচারে। এবার পুজোয় আরামবাগ মহকুমায় বহু পুজো কমিটি অর্কেস্ট্রা বুকিং করেছেন। আরামবাগের শিল্পীরাও ভিন জেলার অর্কেস্ট্রা টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিয়ে আসছেন। রিহার্সাল চলছে জোরদার। তবে বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় খানিক চিন্তায় রয়েছেন শিল্পী থেকে পুজো উদ্যোক্তারা।
গোঘাটের হাজিপুরের একটি পুজো কমিটির সদস্য মধু পাল বলছিলেন, ‘অষ্টমীর দিনে আমরা অর্কেস্ট্রা বুক করেছি। মা-বোনেরা অনুষ্ঠান দেখতে আসবেন। তাই টিম ম্যানেজারকে বলেছি রুচিপূর্ণ অনুষ্ঠান করতে। এরজন্য পুরনো দিনের গান শোনাতেই অনুরোধ করেছি।’ খানাকুলের হানুয়া এলাকার একটি পুজো কমিটির কর্তা প্রণব সাঁতরার কথায়, ‘আমরাও এবার পুজোয় জলসা করব। সব ধরণের গান গাওয়ার অনুরোধ করেছি। তবে পুরনো দিনের গান শুনতেও আমরা বেশি আগ্রহী।’
বেশ কয়েকবছর পর এবারে বায়না আশায় জলসার টিম ম্যানেজাররা বেশ খুশি। একটি অর্কেস্ট্রা টিমের কর্নধার ধনঞ্জয় সামন্ত বলছিলেন, ‘এবার পুজোয় বুকিংয়ে বেশ ভালোই সাড়া পেয়েছি। ষষ্ঠী থেকে টানা কয়েকদিন বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠান করব। আরামবাগ মহকুমাতেও কয়েকটি মণ্ডপে অনুষ্ঠান হবে। অনেক জায়গাতেই কিশোর কুমার, কুমার শানু সহ পুরনো গান শোনাতে হবে বলে অনুরোধ এসেছে। পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্মকে আনন্দ দিতে গানও হবে।’ দীর্ঘদিন ধরেই জলসা শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন আরামবাগের অর্কেস্ট্রা টিমের কর্ণধার প্রণব মালিক। মানুষকে আনন্দ দিয়েই রুজিরুটি সন্ধান করেন। তিনি বলছিলেন, ‘অনুষ্ঠানে নানা ধরণের অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের। কোথাও ৮০-৯০ দশকের গানের চাহিদা বেশি থাকে। কোথাও আবার ট্রেন্ডিং গান শুনতেই পছন্দ করেন শ্রোতারা। সেই মতো আমাদের সব ধরণের গানের ডালি আমাদের সাজাতে হয়।’
গোঘাটের সঙ্গীত শিল্পী সাহেব মালিক কিশোর কুমার, কুমার শানু, রফির গলা নকল করে গান করেন। এলাকায় খানিক নামডাকও হয়েছে। তিনি বলছিলেন, মেলোডি গান আমার গাইতে ভালো লাগে। কয়েকবছর আমাদের শিল্পীদের চাহিদা তেমন ছিল না। এবার পুজোয় ভালো সাড়া পেয়েছি।’ গোঘাটের এক অর্কেস্ট্রা টিমের সদস্য বলছিলেন, ‘আমাদের কিশোর, শানু, আশা-লতা কণ্ঠী রয়েছেন। সবার গানের ডালি নিয়ে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’