• পালচৌধুরীদের বাড়ি যেন বাকিংহাম প্যালেস! এখন জরাজীর্ণ স্থাপত্যের মাঝে পুজো নেন উমা
    বর্তমান | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: মাটি থেকে মাথা তুলে আজও দাঁড়িয়ে আছে উঁচু উঁচু থামগুলি। সেগুলির মাথায় পরিকল্পিত কারুকাজ। ছাদ সমেত বাড়ির অধিকাংশই আজ ধসে গিয়েছে। তবুও বেশ বোঝা যায়, এটি একটি প্রতিপত্তি সম্পন্ন জমিদার বাড়ির নাটমন্দির। তার একপ্রান্তে ছাদহীন ঠাকুর দালানে এখন বাড়ির মেয়েকে বরণ করার তোড়জোড় শুরু চলছে। প্রচলিত আছে, রানাঘাটের ৩০০ বছরের প্রাচীন এই বাড়ির ‘আর্কিটেকচার’ মিলে যায় ব্রিটেনের প্যালেস বাকিংহাম এবং হাজারদুয়ারির সঙ্গে। তাই সেই বাড়ির পুজো কেবল শারদীয়াই নয়, রানাঘাটের অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতির অঙ্গও বটে। একসময় এই পুজো ১০দিনের হলেও, লোকবলের অভাবে আজ চারদিনেই শেষ হয়।

    একসময় পালচৌধুরীরা রানাঘাটের জমিদার ছিলেন। নদীপথে তাঁদের বাণিজ্য চলত কলকাতার বড়বাজারে। কৃষ্ণপান্তি পাল এবং শম্ভুপান্তি পালের উদ্যোগে এই জমিদারির পত্তন হয়েছিল। পরে তাঁরা ‘চৌধুরী’ উপাধি পান। শোনা যায়, একসময় নাকি তাঁদের জমিদারির প্রতিপত্তি এতই বেড়েছিল যে, ইংরেজরা কৃষ্ণপান্তিকে ‘রাজা’ উপাধি দিতে চায়। কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্র রয়েছেন, তারপরেও এক নদীয়ায় দুই রাজা? রাজি হননি কৃষ্ণপান্তি। তবে জমিদারির প্রতিপত্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা। পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই বাড়ির গড়নের সঙ্গে বাকিংহাম প্যালেস এবং মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারির অদ্ভুত মিল রয়েছে। তাছাড়া এই পরিবারের সঙ্গে ইংল্যান্ডের বিশেষ যোগাযোগও ছিল। তবে গোটা বাড়িটাই আজ প্রায় ধসে গিয়েছে। বড় বড় বেশকিছু থাম ও চারপাশে কয়েকটি দেওয়াল আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। এহেন পরিবেশে আজও মায়ের আরাধনা হয় নিষ্ঠার সঙ্গে। তবে জমিদারি না থাকায় জৌলুস কিছুটা ফ্যাকাশে হয়েছে। পুজোর সঠিক বয়স আন্দাজ করা বেশ কঠিন। তবে তা যে ৩০০ বছরের কাছাকাছি, এব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে চর্চা করা ব্যক্তিত্বরা।  পারিবারিকভাবে প্রচলিত ইতিহাস বলে, রানা ডাকাতের সঙ্গেও সেকালে এবাড়ির কর্তা-ব্যক্তিদের সঙ্গে বেশ যোগাযোগ ছিল। সেই ‘বিশেষ যোগাযোগ’ থাকার সুবাদেই নাকি পালচৌধুরীদের ব্যবসার নৌকা কখনও নদীপথে ডাকাতির সম্মুখীন হয়নি। বর্তমান প্রজন্মের অঞ্জন পালচৌধুরী বলেন, একসময় আমাদের পুজো ১০দিন ধরে হতো। মহালয়ার পরদিন, অর্থাৎ প্রতিপদ থেকেই শুরু হয়ে যেত দেবীর আরাধনা। যদিও ১৯৯৩ সাল থেকে বিভিন্ন কারণে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুজোয় পশুবলির প্রথা কোনওকালেই ছিল না। বরাবরই চালকুমড়ো বলি হয়। অষ্টমীতে কুমারী পুজো আমাদের বাড়ির অন্যতম আকর্ষণ। জমিদারির প্রতিপত্তি ক্রমাগত বাড়তে থাকায়, কৃষ্ণপান্তি এবং শম্ভুপান্তি ঠিক করেন বেশ ঘটা করে পুজো করবেন। সেই থেকেই শুরু।

    ইতিহাস বলছে, পুজোর সময় এককালে বিরাট নাচ-গানের আসর বসত পালচৌধুরী বাড়িতে। যদিও এখন সেসব আর নেই। সময় যত যাচ্ছে, ততই আরও হারিয়ে যাচ্ছে পালচৌধুরীদের প্রকাণ্ড বাড়িখানা। কোনওমতে তারই মাঝে পুজোর জায়গাটুকু অবশিষ্ট রয়েছে। সারাবছর নিস্তব্ধতার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকলেও, পুজোর চারদিন প্রায় ধ্বংসস্তূপ হয়ে আসা বাড়িটা মুখরিত হয়ে ওঠে। যেন প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়ে কয়েক দিনের জন্য সেও ফিরে যায় প্রায় ৩০০ বছর আগের সেই জৌলুসপূর্ণ যুগের খোঁজে।
  • Link to this news (বর্তমান)