সর্বমঙ্গলা মায়ের ঘটোত্তোলন বিশেষ মুহূর্তে উপস্থিত জেলাশাসক
বর্তমান | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: বোল তুলেছে ঢাকিরা। বেজে চলেছে বাদ্যযন্ত্র। মঙ্গলধ্বনি দিচ্ছেন মায়েরা। কৃষ্ণসায়র থেকে ঘট ভরে ঘোড়ার গাড়িতে উঠলেন প্রধান পুরোহিত। মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হলো ঘোড়ার গাড়ি। সেই রাজ আমলের প্রথা। আজও বিলীন হয়নি রাজাদের শহর বর্ধমানে। প্রথা মেনে প্রতিপদে ঘটোত্তোলনের পর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হল। রাঢ়বঙ্গের দেবী সর্বমঙ্গলা। এদিন থেকে শুধু বর্ধমানেই নয়, রাঢ়বঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা, শহরজুড়েই শারদোৎসব শুরু হয়ে গেল। কষ্ট, বিষাদ ভুলে শস্যগোলা এখন ‘ফেস্টিভমুডে’। ঘটোত্তোলনের বিশেষ মুহূর্তে উপস্থিত থাকলেন জেলাশাসক আয়েশা রানি এ, পুরসভার চেয়ারম্যান পরেশ সরকার, বিধায়ক খোকন দাস সহ অন্যান্যরা। মন্দিরের প্রধান পুরোহিত অরুণ ভট্টাচার্য বলেন, বহু বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে। এদিন থেকেই সর্বমঙ্গলা মন্দিরে শুরু হয়ে গেল বিশেষ পুজো। দশমী পর্যন্ত চলবে।
বর্ধমানের বাসিন্দারাও যেন এই দিনটির অপেক্ষায় থাকেন। এদিন নতুন পোশাকে অনেকেই কৃষ্ণসায়রে হাজির হয়ে যান। ঘটোত্তোলনের বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী থাকলেন তাঁরা। আবার অনেকেই হাজির হলেন মন্দিরে। সন্ধ্যা পর্যন্ত মন্দিরে থেকে তাঁরা বিশেষ পুজো দেখলেন। পুণ্যার্থী অক্ষয় চট্টোপাধ্যায় বলেন, ঘটোত্তোলনের দৃশ্য নজরকাড়ার মতো। রাজকীয়ভাবেই ঘট আনা হয়। প্রতিবছরই সকালে মন্দিরে হাজির হয়ে যাই। এমন মুহূর্ত ‘মিস’ করা যায় না। আরেক পুণ্যার্থী চন্দনা মণ্ডল বলেন, মা জাগ্রত। সবার মঙ্গল করেন। সারা বছরই মন্দিরে ভিড় হয়। প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত মায়ের বিশেষ পুজো দেখতে আমার মতো অনেকেই হাজির হন। হোমের আয়োজন করা হয়। এছাড়া, মন্দিরে বসে পুজো দেখার অনুভূতি অন্যরকম। শুদ্ধমন্ত্রচ্চারণ আর মন্দিরের শান্ত পরিবেশ মুগ্ধ করে দেয়। আরএক পুণ্যার্থী বলেন, বছরের প্রায় সময়ই মন্দিরে আসি। কিন্তু, পুজোর দিনগুলিতে মন্দিরে আসতে না পারলে মন খারাপ হয়। শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে যাই। কিন্তু সর্বমঙ্গলা মন্দিরে না এলে মনে যেন স্বস্তি আসে না।
বর্ধমান শহরে থিমের ছড়াছড়ি। কোথাও উঠে আসছে বৌদ্ধ মন্দির, আবার কোথাও তৈরি হয়েছে ‘মায়াজাল’। দেবীপক্ষের শুরুতেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে ১৭টি পুজোর উদ্বোধন হয়ে গিয়েছে। তবে এত কিছুর মাঝেও সর্বমঙ্গলা মন্দিরে ভিড় কমে না। যে যার মতো করে মায়ের কাছে গিয়ে প্রার্থনা করেন। বর্ধমান পুরসভার চেয়ারম্যান বলেন, সর্বমঙ্গলা মায়ের মাহাত্ম্য অনেক। শুভ কাজ শুরু করার আগে শহরের বাসিন্দারা মায়ের কাছে হাজির হন। তিনি বিপদ থেকেও রক্ষা করেন। প্রতিপদের সকালে মন্দিরে এসে মন ভালো হয়ে যায়। রাজাদের আমলে চালু করা প্রতিটি প্রথা এখনও রয়ে গিয়েছে। আগামী দিনেও তা ধরে রাখা হবে। এদিন থেকেই বর্ধমানের মানুষ উৎসবে শামিল হয়ে গিয়েছে। পুণ্যার্থীরা বলেন, নবমীর দিন কুমারীপুজো হয়। ন’জন কুমারীকে দুর্গার ন’টি রূপে পুজো করা হয়। ওইদিন মন্দির চত্বরে ভিড় উপচে পড়ে। এবারও তেমনটাই হবে। এছাড়া, প্রতিদিনই বিশেষ পুজোর পাশাপাশি হোমও হয়। শুধু বর্ধমান নয়, বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা এখানে পুজো দেখতে আসেন। কলকাতার পুজো ছেড়েও এখানে এসে অনেকেই মায়ের কাছে প্রার্থনা করে যান। রাজাদের আমলেও এমনই জাঁকজমক করেই পুজো হতো। তখনও পুজোর দিনগুলিতে মন্দির চত্বরে পুণ্যার্থীদের ঢল নামত। এখনও সেই ছবির ব্যতিক্রম হয়নি।