বিষ্ণুপুর: পেটের ব্যামো নিরাময়ে দুর্গাপুজো শুরু করেন ভড়ার জমিদার গোপাল মণ্ডল
বর্তমান | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
সংবাদদাতা, বিষ্ণুপুর: পেটের ব্যামো সারাতে শুরু হয়েছিল দুর্গাপুজো। হ্যাঁ, এমনই কাণ্ড ঘটেছিল বিষ্ণুপুরের ভড়ায়। স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুজো প্রচলন করেছিলেন ভড়ার জমিদার গোপাল মণ্ডল। তিনি একসময়ে ছিলেন মল্লরাজাদের খাজনা আদায়কারী। ভড়া অঞ্চলে তিনি খাজনা আদায় করে বেড়াতেন। একবার তাঁর মারাত্মক পেটের ব্যামো দেখা দিল। কোনও কিছুতেই ব্যামো সারছিল না। এমন সময়ে একদিন রাতে মল্লরাজাদের আরাধ্যা দেবী মা মৃন্ময়ী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, ভড়া গ্রামে শক্তিপুজো শুরু করতে। গোপাল মণ্ডল তখনও জমিদার হননি। ফলে অর্থের অভাব ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি খড় ও তালপাতা দিয়ে মায়ের মন্দির বানান। পদ্মফুলের ভ্যাট ও চাষের গুড় দিয়ে ‘ভ্যাটনাড়ু’ বানিয়ে মায়ের প্রসাদ বানানো হয়। দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করার পর তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তার কিছুকাল পরেই তিনি ভড়া সহ আশেপাশের বেশ কয়েকটি মৌজার জমিদারিত্ব লাভ করেন। তারপর থেকে ধুমধাম করে পুজো হয়। কালের নিয়মে জমিদারিত্ব চলে গিয়েছে। তবে এখনও জমিদারবাড়িতে রয়েছে আগেকার ভগ্ন নাটমন্দির। মণ্ডলবাড়ির সদস্যরা অনেকেই কর্মসূত্রে বাইরে চলে গিয়েছে। তবু পুজোর সময় তাঁরা প্রায় সকলেই গ্রামে ফেরেন। প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগে চালু হওয়া পুজো আজও জমিদার বাড়িতে নিষ্ঠার সঙ্গে হয়ে আসছে। আগেকার তালপাতার ছাউনির বদলে ঠাকুর দালান হয়েছে। সেখানেই ধুমধাম করে পুজো হয়ে আসছে। আগেকার মতো নহবত না বসলেও সাবেকি পুজোয় মণ্ডল পরিবারের সদস্যরা সব ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগে যখন ভাস্কর রাওয়ের নেতৃত্বে মল্লভূম বিষ্ণুপুরে বর্গি আক্রমণ হয় তখন মল্লরাজের নির্দেশে কোতুলপুরের লাউগ্রাম থেকে পরিবার নিয়ে বিষ্ণুপুরের ভড়া গ্রামে চলে আসেন মণ্ডল পরিবারের আদি পুরুষ লুইধর মণ্ডল। বর্ধমান রাজার তালুক ওই ভড়া অঞ্চল তখন ছিল গভীর জঙ্গল ঘেরা। সেখানে বসবাস করত ‘ভড়’ নামক এক জনজাতি। তারা কৃষিকাজ জানত না। জঙ্গলের পশু শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। লুইধরের পরিবার ভড়ায় বসবাস শুরু করার পর প্রথমদিকে তাঁদেরও একইভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে হতো। কিন্তু পরবর্তীকালে ভড়া এলাকা বিষ্ণুপুরের মল্লরাজার অধীনে আসা লুইধরের নাতি গোপাল মণ্ডলকে ওই এলাকার খাজনা আদায় করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জমিদারবাড়ির সদস্য দেবাশিস মণ্ডল বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা জীব হত্যার বিরোধী ছিলেন। তাই পুজোয় চালকুমড়ো বলি হয়। পুজোর সময়ে পরিবারের বধূরা সাবেকি শাড়ি পরে আর পায়ে আলতা রাঙিয়ে চৌদল নিয়ে নবপত্রিকা আনতে যান স্থানীয় ‘সানবাঁধা’ সায়রের ঘাটে।