‘ভোট তো হো গ্যায়া, অব খালি রেজাল্ট নিকলনা বাকি হ্যায়!’
পাটনার ডাকবাংলো মোড়ে গরম ধোঁয়া ওঠা পনির কচুরিতে কামড় দিতে দিতে বলছিলেন সুশীল চৌধুরী। ভোট হয়ে গিয়েছে মানে? কীভাবে হয়ে গেল? ৬ তারিখ তাহলে কী হবে? এসআইআরের কথা বলছেন নাকি? রেজাল্টই বা কী? ‘বদলাও কা হাওয়া হ্যায়।’ মহাগঠবন্ধন সরকার আসবে নাকি? কচুরির গরমটা এ গাল-ও গাল করে সামলাতে যতটুকু সময়। বললেন, ‘ফির একবার নীতীশ বাবুকা সরকার!’ কিছুদূর এগোতেই বছর ৫৬’র রাঘব রাজের পানের দোকান। তাঁরও সাফ কথা, হাওয়া আছে ঠিকই, কিন্তু নীতীশবাবু যতদিন বেঁচে আছেন, তিনিই বিহারের মুখ্যমন্ত্রী।
এ যেন ঠিক ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক-চিত্র। বিজেপির হাওয়া নাকি প্রবল। সবাই মানছে। কিন্তু কে জিতবে জিজ্ঞেস করলেই উত্তর এক, মমতা। ভোটের ফল বেরনোর পর দেখাও গিয়েছিল তাই। বিহারেও কি এবার তেমন কিছু হতে চলেছে নাকি? নাকি নীতীশ তথা বিজেপির তথাকথিত ‘সুশাসনের’ ফাঁক-ফোকর গলে কোথাও ‘বদলাও’ অর্থাৎ পরিবর্তনের চোরাস্রোত ভিজিয়ে যাচ্ছে পা? কিছুদূর যেতেই মিলল উত্তর, ‘২০ বছরে বিহারে অনেক কিছু হয়েছে। বিদ্যুৎ, রাস্তা, ফ্লাইওভার... কিন্তু তাও আমাদের কেন বেঙ্গালুরু, চেন্নাই কিংবা নয়ডা যেতে হবে বলুন তো? কেন এখানে কাজ নেই? কারণ এটা বিহার। সবকিছু বদলালেও আমাদের ভবিষ্যৎ বদলায় না।’ বলছিলেন জওহরলাল নেহরু মার্গের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা বছর উনিশের যুবক সুরজ কুমার। সমস্তিপুর থেকে কম্পিউটার ক্লাস করতে রোজ পাটনা আসেন সুরজ। শুধু তিনি নন, সুরজের মতো আরও বহু যুবক সরকারি চাকরির আশায় রোজ বিকেলে গান্ধী ময়দানে পৌঁছে যান ঘাম ঝরাতে। সামনেই পুলিশ কনস্টেবল পদে কয়েক হাজার নিয়োগ হতে চলেছে। তাই যুবকদের আসার সংখ্যাও বেড়েছে। পার্শ্ববর্তী জাহানাবাদ, আরওয়াল কিংবা তারও অনেক দূরের জেলাগুলি থেকে রোজ পাটনায় আসেন ওঁরা। যে করে হোক একটা সরকারি চাকরি চাই। এইসব যুবক সাফ জানাচ্ছেন, কোনও পরীক্ষা হলে পেপার লিক হওয়া আম ব্যাপার। নীচুতলার সরকারি আধিকারিকরা ঘুষ ছাড়া কোনও কাজ করে না। তাই বদল তো প্রয়োজন!
কিন্তু বদল হলে কে? লালু-পুত্র তেজস্বী? নাকি সদ্য বিহারের রাজনীতিতে উদয় হওয়া প্রশান্ত কিশোর? ‘ইয়ে বিহার হ্যায়। কুছ ভি হো সকতা হ্যায়..।’ ধোঁয়াশা রেখে বলতে শুরু করেছিলেন এক যুবক। একরকম তাঁকে থামিয়ে দিলেন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক যুবক। বলে উঠলেন, ‘প্রশান্ত কিশোর নয়া হ্যায়। অভি থোড়া টাইম লাগেগা। ইসবার তেজস্বী কা হাওয়া গরম হ্যায়।’ এ কথা শুনতেই পবন নামে এক যুবক হিন্দি-ভোজপুরি মিশিয়ে যা বললেন, তার তর্জমা করলে দাঁড়ায়, নীতীশের বয়স হয়েছে। তাঁর মতোই কাজ করতে পারবে, এমন কোনও নতুন মুখ চাই।
বিহারে এবার ১৮-১৯ বছরের নতুন ভোটারের সংখ্যা ১৪ লক্ষ। এছাড়াও ১.৬ কোটি অর্থাৎ বিহারের মোট ভোটারের ২২ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ২৯-এর মধ্যে। তাই যুবা প্রজন্মের মন মর্জির উপরই যে এবার বিহারের ভোট ভাগ্য অনেকাংশে নির্ভর করছে, তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশও।
আসলে এবারের বিহার বিধানসভার নির্বাচনের রসায়ন সত্যিই কঠিন। বরাবরের মতো জাত-পাত ইস্যু তো রয়েছেই। সেইসঙ্গে এই প্রথমবার কোনও রাজ্যে এসআইআরের পর কোনও নির্বাচন হতে চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই গোটা দেশের নজর বিহারের দিকে। পাশাপাশি প্রথমবার বিহারে এনডিএ-মহাগঠবন্ধন এবং পিকে’র জন সুরাজের ত্রিমুখী লড়াই। সবমিলিয়ে তাই এবার সত্যিই বিহারে ‘কুছ ভি হো সকতা হ্যায়।’