• দুর্গাপুর গণধর্ষণ: ফোনে সাড়া দেয়নি ‘বন্ধু’, নির্যাতিতাকে ফেরায় দুষ্কৃতীরাই
    বর্তমান | ০১ নভেম্বর ২০২৫
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর: সহপাঠীর উপর অগাধ ভরসা রেখে রাতে জঙ্গলের সৌন্দর্য দেখতে বেরিয়েছিলেন দুর্গাপুরের নির্যাতিতা ডাক্তারি পড়ুয়া। কিন্তু সেই ভরসা কিংবা বিশ্বাস কোনওটাই রাখতে পারেনি ওয়াসিফ আলি নামে ওই সহপাঠী। জঙ্গলে সুযোগ বুঝে বান্ধবীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে ঘনিষ্ঠ হয়। তখনই সেখানে হাজির হয় দুষ্কৃতীরা। পুলিশ চার্জশিটে নির্যাতিতার বয়ানকে হাতিয়ার করে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উল্লেখ করেছে। পাশাপাশি, আরও ভয়ঙ্কর তথ্যও উঠে আসছে। চার্জশিটে পুলিশ দাবি করেছে, দুষ্কৃতীরা ঘটনাস্থলে আসা মাত্রই বান্ধবীকে ওই অবস্থায় ফেলে পালিয়ে আসে ওয়াসিফ। অসহায় হয়ে তাকে বারবার ফোন করতে থাকেন নির্যাতিতা। কিন্তু সে ফিরে আসেনি। পরে দুষ্কৃতীরাই তাকে ফোন করে নির্যাতিতাকে জঙ্গল থেকে নিয়ে যেতে বলে। তখনই ওয়াসিফ যায়। গিয়েও জঙ্গলে ঢুকতে চায়নি। বাধ্য হয়েই নির্যাতিতা নিজেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসেন। তারপর মূল রাস্তা থেকে তাঁকে হস্টেলে ফিরিয়ে দেয়। এখানেই শেষ নয়, হস্টেলে ফিরে নির্যাতিতাকে ওয়াসিফ বলেছিল, ‘সত্য ঘটনা কাউকে না বলতে। মোবাইল ফোন নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে তিনি জানিয়ে দেন, চুরি হয়ে গিয়েছে।’ আসার পথেও বারবার  নির্যাতিতাকে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে গিয়েছে ওয়াসিফ। পুলিস এই কারণেই ‘অপরাধের ষড়যন্ত্র’ ধারাটিও মামলায় যুক্ত করেছে। 

    পুলিশের দেওয়ার চার্জশিটে দেখা গিয়েছে, মোট ৫১ জনকে সাক্ষী করেছে পুলিশ। প্রথম সাক্ষী অবশ্যই নির্যাতিতা। ২ ও ৩ নম্বর সাক্ষী যথাক্রমে নির্যাতিতার বাবা ও মা। পরের সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়েছে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মহিলা হস্টেলের দুই ওয়ার্ডেনকে। সাক্ষী হয়েছেন নির্যাতিতার সহপাঠী থেকে হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষী ও কর্মীরা। তৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সাক্ষীর তালিকায় নাম রয়েছে অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যদেরও। তাঁরা কেউ অভিযুক্তের মা, কেউ বোন, কেউ আবার স্ত্রী। বৃহস্পতিবার ২০ দিনের মাথায় গণধর্ষণ মামলার চার্জশিট আদালতে পেশ করে পুলিশ। শুক্রবার ছিল মামলার প্রথম শুনানি। এদিন, দুর্গাপুর এসিজেএম শুভ্রকান্তি ধরের এজলাসে ছ’জন অভিযুক্তকেই তোলা হয়। নির্যাতিতার সহপাঠীর আ‌ইনজীবী কিছু নথি চান। সরকারি আইনজীবী জানিয়ে দেন, চার্জশিটের কপি সহ সব নথিই প্রত্যেক অভিযুক্তকে দেওয়া হয়েছে। এরপরই জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের তরফে অভিযুক্তদের হয়ে সওয়াল করেন পুজা কুড়মি। তিনিও সব নথি না পাওয়ার দাবি করেন। তখন সরকারি আইনজীবী বলেন, ‘এই মামলা আমরা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চাই।

     বিভিন্ন নথি চেয়ে আদালতের সময় নষ্ট করার কোনও জায়গা নেই। আমরা সব নথি এমনকী সিসিক্যামেরার ফুটেজ সহ ডিজিটাল নথিও পেন ড্রাইভের মাধ্যমে অভিযুক্তদের দিয়ে দিয়েছি। তারপর পুজা কুড়মি অভিযুক্ত শেখ রিয়াজুদ্দিন ও সফিক শেখের হয়ে জামিনের আর্জি করে জানান, মাত্র ২০০ টাকা নেওয়ার জন্য‌ তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতির ধারা দেওয়া হয়েছে! সরকার পক্ষ থেকে পাল্টা বলা হয়, নির্জন জঙ্গলে ধর্ষিতা মহিলার কাছ থেকে ২০০ টাকা হরণ করা  দু’কোটি টাকার ডাকাতির সমান। এসিজেএম অভিযুক্তদের জামিনের আবেদন খারিজ করে দেন। দুর্গাপুরের অতিরিক্ত ডিস্ট্রিক্ট সেশন জজের কাছে মামলাটি স্থানান্তর করেন। আজ শনিবারই মামলার পরবর্তী শুনানির দিনও ধার্য করেন। সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘নির্যাতিতা যাতে সঠিক বিচার পান, তার জন্য আমরা বদ্ধপরিকর।’ 
  • Link to this news (বর্তমান)