সাইলেন্ট অপারেশন! নাম বাদ মতুয়াদের, জামালপুরের জুটিহাটি গ্রামে আতঙ্কে বাসিন্দারা
বর্তমান | ০৬ নভেম্বর ২০২৫
সুখেন্দু পাল, ঝাপানডাঙা (জামালপুর): জামালপুরের ঝাপানডাঙা স্টেশন থেকে কিছুটা গেলেই জুটিহাটি গ্রাম। অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে, বছর দেড়েক আগে সংবাদ মাধ্যমে ঘুরে ফিরে আসছিল এই গ্রামের নাম। গ্রামবাসীদের আধার কার্ড নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার খবরে শোরগোল পড়েছিল রাজ্যে। গ্রামটিতে মূলত বাংলাদেশ থেকে আসা মতুয়া সম্প্রদায়ের বাস। সামনে সবুজ মাঠ। রাস্তার দু’পাশে আম সহ বিভিন্ন ধরনের গাছ। বেশ সাজানো গোছানো। যেন শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস। সেই গ্রামটিই বদলে গিয়েছে রাতারাতি। বাড়িতে বাড়িতে আতঙ্ক। সৌজন্যে এসআইআর।
গ্রামের একটি আমগাছের ছায়ায় বসেছিলেন ৬০ বছরের মাধব সরকার। পঞ্চায়েত, বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। পোলিং এজেন্টরা তাঁর নামে টিক দিয়ে টিকিট দিয়েছেন। কিন্তু, ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে দেখেন তাঁর নামই নেই। একরাশ ক্ষোভ নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন। আফসোস করে তিনি বলতেন, ‘ভোটটা দিতে পারলাম না!’ তবে, মনে তখনও কোনও আতঙ্ক ছিল না। এবার তিনি বেশ ভীত। গ্রামেরই আর এক বাসিন্দা সুষমা হালদার। বয়স ষাটের কোঠা ছাড়িয়েছে। অতীতে বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোটও দিয়েছেন। তাঁর নামও লোকসভা নির্বাচনে আশ্চর্যজনকভাবে উধাও! গ্রামবাসী যোগেন বিশ্বাসেরও একই অবস্থা। তিনি লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর নাম তালিকায় নেই। মাধববাবু থেকে যোগেনবাবু—জুটিহাটিতে কেউ রয়েছেন ৩০ বছর। কেউ আবার ২০ বছরের বেশি সময়ের বাসিন্দা।
লোকসভা ভোটের আগে এসআইআরের নামগন্ধ ছিল না। তা হলে কেন মাধববাবুদের নাম বাদ? গ্রামবাসীদের নালিশ—‘বুঝলেন না, এসব আসলে সাইলেন্ট অপারেশন! সন্দর্পণে তালিকা থেকে আমাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আমাদের বদ্ধমূল ধারণা, আজকের এই এসআইআরের বীজ পোঁতা হয়েছিল অনেক আগেই। এখন বুঝতে পারছি। ইঙ্গিত পেয়েছিলাম আধার কার্ড নিষ্ক্রিয় করার সময়।’ যোগেনবাবুরা লোকসভায় ভোট দিতে না পেরে ভেবেছিলেন, কমিশনের কাজে হয়তো ভুলচুক হয়ে গিয়েছে। ফের নাম তালিকায় আসবে। কিন্তু আসেনি। চালু হয়ে গিয়েছে এসআইআর। রাতের ঘুম উবেছে গ্রামবাসীদের।
‘এসআইআর ঘোষণার পর সত্যিই ঘুমোতে পারছি না।’ বলছিলেন গ্রামের এক বৃদ্ধা। এর পরেই তাঁর সংযোজন, ‘আধার কার্ড নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার পর আমাদের যে অবস্থা হয়েছিল, এখন ঠিক তাই হচ্ছে।’ বৃদ্ধার কথায় থাবা বসিয়ে এক যুবক বলতে শুরু করেন, ‘এসআইআরের কাজ শেষ হলেই শুরু হবে এনআরসি। তখন আবারও দেশছাড়া হতে হবে। আমরা তো কেউ আর শখে বাংলাদেশ থেকে আসিনি। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ ছিল অনেকেরই।’
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপে সে সময় নিষ্ক্রিয় আধার সক্রিয় হয়েছিল। কিন্তু, তখন থেকেই সিদুঁরে মেঘ দেখতে শুরু করেছিলেন জুটিহাটির বাসিন্দারা। এদিন ধীরেন হাওয়ালাদার বলছিলেন, ‘এখন বুঝতে পারছি, অনেক আগেই মতুয়াদের টার্গেট করা হয়েছিল। প্রথমে আধার কার্ড নিষ্ক্রয় করা হয়। পরে লোকসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়। বাকিদের নাম এসআইআরে বাদ যাবে।’ স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি নেতাদের আশ্বাস এখন যোগেনবাবুদের কাছে তেতো ঠেকছে। তাঁরা বারবার বলে আসছিলেন, এসআইআর হলেও মতুয়াদের নাম বাদ যাবে না। এমন কথায় বিশ্বাস করে হাত উপুড় করে ভোট দিয়েছিলেন পদ্মে। এবার সেই আশ্বাস ব্যুমেরাং হওয়ার জোগাড়। বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের আশ্বাসে আর ভরসা পাচ্ছেন না গ্রামের কেউ। তৃণমূল নেতা দেবু টুডু বলেন, ‘বিজেপির ভাঁওতাবাজি মানুষ ধরে ফেলেছে। নির্বাচনেই জবাব দেবে।’ সিপিএম নেতা হারাধন ঘোষ বলেন, ‘বৈধ ভোটারের নাম যেন তালিকা থেকে বাদ না যায়।’