দিল্লির উপর বেদম চটেছেন শুভেন্দু? অভিজিতের ‘বিস্ফোরণে’র পিছনে দলের একাংশ, চর্চা বিজেপিতেই
প্রতিদিন | ১০ নভেম্বর ২০২৫
নীলকণ্ঠ বিশ্বাস: বিজেপির দিল্লির নেতৃত্বের উপর কি খুবই চটেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপি সূত্রে এমনই খবর সামনে এসেছে। এতটাও বলা হচ্ছে যে তমলুকের সাংসদ প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় দিল্লিকে ইঙ্গিত করে যে তোপ দেগেছেন, তার পিছনেও বিজেপির একটি শিবির কাজ করছে, শুভেন্দুরও নীরব সমর্থন রয়েছে। যদিও শুভেন্দু শিবির এধরনের কথা কথা অস্বীকার করেছে। তবে খবর হল, এসআইআর নিয়ে শুভেন্দুরা উচ্চগ্রামে বিজেপির পক্ষে কথা বললেও এই বিষয়টি যে বুমেরাং হতে চলেছে, এমন ইঙ্গিত পেয়ে তাঁরা যথেষ্টই উদ্বিগ্ন।
সূত্রের খবর, প্রকাশ্যে যাই বলুন, বিজেপির রাজ্য নেতারা বুঝতে পারছেন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আবার বিপুলভাবে জিতে আসবে। সাংগঠনিকভাবেও বিজেপি তৈরি নয়। দলে গোষ্ঠীবাজির চোরাজোত প্রবল। এই অবস্থায় শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদাররা চাইছিলেন দিল্লি সবরকম ক্ষমতা ব্যবহার করে তৃণমূলকে ধাক্কা দিক। তাই একসময় তাঁরা সিবিআই, ইডি, এনআইএ-র কথা বারবার বলতেন। বিজেপির অঙ্ক ছিল নির্দিষ্ট কিছু মামলায় তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উইকেট ফেলে দিতে পারলে একদিকে শাসকদল ভোট করতে পারবে না। অন্যদিকে মানুষও তৃণমূলের উপর বিরক্ত হবেন। কিন্তু হালহকিকত দেখে বিজেপি নেতারা হতাশ। দিল্লি সূত্রে খবর, তাঁরা চান রাজ্য সংগঠন নিজেরা কাজ করুক। দিল্লি-নির্ভরতা কমাক। তাছাড়া বাংলার মানুষ ভোট দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে।
এজেন্সি যদি তিন-চারজনকে নতুন করে ধরেও, তাতে মমতা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার তাস খেলে দেবেন। বিজেপির হিতে বিপরীত হবে। শুভেন্দু, সুকান্তরা তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং অন্যান্য ইস্যু করতে চান। এখন সেসব লাটে উঠে এসআইআর ইস্যু হয়ে তৃণমূলেরই সুবিধা হয়ে গেছে। সূত্র বলছে, কদিন আগে ত্রিপুরা থেকে আসা এক বড় নেতা বাংলার নেতাদের বলে গেছেন, এসআইআর ইস্যু নিয়ে বেশি লাফালে বাংলা ও ত্রিপুরায় বিজেপির বিরাট ক্ষতি। বাংলায় বিজেপির ভোট ১৮.৫% থেকে ২১.৩% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে আসন কমবে, হারের ব্যবধান বাড়বে। বাংলায় হিন্দুভোট মানেই বিজেপি নয়। আর এসআইআরে বহু হিন্দু ভোটারও হয়রানিতে পড়ছেন। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হলেই ক্ষোভ বাড়বে। বিজেপি সিএএ ঘোষণা করে কতটা সামাল দিতে পারবে, তা নিয়ে নেতারা নিশ্চিত নন। একাংশ দিল্লিকে বলেছে, অবিলম্বে সিএএ স্পষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করে বলে দিতে হবে কোনও হিন্দুর ভোট বাদ যাবে না।
দিল্লি নাকি বিষয়টা খতিয়ে দেখছে। বিজেপির সূত্র বলছে, অমিত শাহ এখনও শুভেন্দুকেই গুরুত্ব দেন, এটা ঠিক। কিন্তু দল না জিতলে শুভেন্দুও তো বিপাকে পড়বেন। শুভেন্দু চাইছেন বাংলার সরকারবিরোধী ইস্যু নিয়ে ভোটে যেতে। কিন্তু দিল্লির সৌজন্যে সব ইস্যু ধামাচাপা দিয়ে এসআইআর নিয়ে নেমে পড়েছে তৃণমূল, এবং ইস্যুটা কেন্দ্রবিরোধী হয়ে গেছে, যার মাশুল দিতে হবে রাজ্য বিজেপিকে। দিল্লির আবার বক্তব্য, রাজ্যেরই একাংশ নাকি এসআইআর চাইছিল। এই অবস্থায় অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় যেভাবে দিল্লির সমালোচনা করেছেন, তাতে বিজেপির মধ্যেই নানা চর্চা চলছে। একাংশ বলছে, মুখের ভাষ্য অভিজিতের, মনের কথা শুভেন্দুর। তাঁর পক্ষে দিল্লিকে চটিয়ে এগুলো বলা সম্ভব নয়, পদাধিকারে উচিতও নয়, তাই নিজে না বলে অভিজিৎকে দিয়ে বলিয়েছেন। তার কোনও প্রতিবাদও করেননি। দল নাকি অভিজিৎকে দিয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোল বিবৃতি করাচ্ছে। কিন্তু তার আগে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। শুভেন্দুপন্থী শিবিরের বক্তব্য, রাজ্য বিজেপিতে যেটুকু ঝাঁজ, সেটা শুভেন্দুরই কৃতিত্ব। দিল্লির উপর বেদম চটেছেন শুভেন্দু?
কিন্তু তৃণমূলের মতো শক্তিশালী দল ও সরকারকে ধাক্কা দিতে গেলে দিল্লিকে যে প্রেসক্রিপশনে চলতে হবে, সেটা পুরো করানো যাচ্ছে না। রাজ্য বিজেপির এক নেতা বলেন, “আমাদের অবস্থা বাম জমানার প্রদেশ কংগ্রেসের মতো। দিল্লিকে বলেও নড়ানো যায় না। শেষে তৃণমূল তৈরি হয়েছিল বলে সিপিএম গেছে। আমাদেরও না হতাশা থেকে তেমন কিছু ভাবতে হয়।” জানা গিয়েছে, দিল্লির কাছে শুভেন্দুশিবিরের সুপারিশ হল এসআইআরকে প্রচারের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে রাজ্যের ইস্যুকে আনতে এজেন্সির সক্রিয়তা এবং সিএএ ঘোষণা করিয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোল। তিনি চাইছেন পরোক্ষ কৌশলে তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক ভাগ করতে, সেখানেও কেন্দ্রের সাহায্য দরকার।
বিরোধী দলনেতা মরিয়া হয়ে সর্বত্র ঘুরছেন এবং এসআইআরের ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করছেন। বলছেন, “এসআইআর-এ ক্ষতি হবে তৃণমূলের। বহু বহিরাগত পালিয়ে যাচ্ছে” ওদিকে, বিজেপি নেতাদের কাছে বারবার ফোন আসছে উদ্বিগ্ন রাজবংশী এবং মতুয়া সংগঠকদের। ফলে বোঝা যাচ্ছে যে, হিন্দুদের উপর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও প্রবল। অথচ বিজেপি নেতাদের হাত-পা বাঁধা, বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না।
এদিকে, আদি বিজেপি বনাম নব্য বিজেপির সংঘাতটাও প্রবল। দিলীপ ঘোষের শিবির শুভেন্দু-শর্মীকের জুটিতে বিজেপির সাফল্য কতটা চাইছেন, তা নিয়ে দলে ধন্দ আছে। আবার সম্মান ফিরে না পেলে দিলীপ ঘোষের শিবিরও পুরো নামবে না। বিজেপি মহলের বক্তব্য, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে যা যা ইস্যু ছিল, সেসব ঢেকে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পুরো দলকে বুথে বুথে নামিয়ে দিয়েছেন। সেখানে আমাদের সংগঠনও দূর্বল, দিল্লিও নিষ্ক্রিয়। ফলে দলের একাংশে হতাশা কাজ করছে। এজেন্সি ঘুমন্ত। দিল্লির হিন্দিভাষী নেতারা এলে তার কোনও প্রভাব নেই। হিন্দুত্বের অস্ত্র বাংলায় ততটা কার্যকর নয়। এই পরিস্থিতিতে মিঠুন চক্রবর্তীও বলে বসেছেন, “এবার না জিতলে আমাদের সব শেষ হয়ে যাবে।” বস্তুত এই মরণ-বাঁচনে সবচেয়ে বড় বাজি একদা তৃণমূল ছেড়ে যাওয়া শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনে। ফলে তিনি যতই ঘুরুন, মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যতই গরম বক্তৃতা দিন, দিল্লির উপর তিনিও বিরক্ত হয়ে জ্বলছেন বলে দলীয় সূত্রে খবর। জানা গিয়েছে, দিল্লির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এসব ক্ষোভ উগরে দিয়ে এখন জরুরি ভিত্তিতে কী কী করা দরকার বলেছেন শুভেন্দু। শিগগিরই আবার দিল্লির সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে খোলাখুলি কিছু কথা বলবেন তিনি। তাঁর সঙ্গে থাকবেন সুকান্ত মজুমদার। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য উগ্র রাজনীতির পক্ষে নন। তবে তিনিও এবিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানিয়েছেন।