• এসআইআর মিলিয়ে দিল, ৩৭ বছর পর পুরুলিয়ার বাড়ি ফিরলেন বৃদ্ধ
    প্রতিদিন | ২৮ নভেম্বর ২০২৫
  • সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: তখন ঘড়ির কাঁটায় লক্ষ্মীবার সকাল সাড়ে আটটা। কলকাতা পুলিশে কর্মরত মামাতুতো ভাই রামানুজ পাঠক দাদা বিবেক চক্রবর্তীকে বাইকে করে নিয়ে আসেন। কিন্তু সব যে অজানা। অচেনা। পথঘাট, ঘর-বাড়ি, এমনকি নিজের প্রিয়জন যারা পরিবারের সদস্য তাঁদেরকে চিনতে পারছেন না ৩৭ বছর আগে ঘরছাড়া ৬৫ বছরের বৃদ্ধ বিবেক চক্রবর্তী। তখন যে তিনি ছিলেন যুবক।

    ডান হাতে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে বাইক থেকে নেমে বাস্তুভিটেতে পা দিতেই ছোট ভাই প্রদীপ চক্রবর্তী এক এক করে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কিন্তু বাবা-মা আজ নেই। তাঁরা দু’জনেই প্রয়াত। এদিকে ততক্ষণে চলে এসেছেন তাঁর ছোট বোন বুলা মিশ্র। তিনি থাকেন আদ্রায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরুলিয়ার (Purulia) পাড়া থেকে আসেন বড় বোন সুনীতি মিশ্র। আর তারপরেই আবেগ আর আনন্দাশ্রুতে ভেসে যান পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর দুই ব্লকের মঙ্গলদা-মৌতড় গ্রাম পঞ্চায়েতের গোবরান্দা গ্রামের চক্রবর্তী পরিবার। ততক্ষণে ভিড় জমিয়েছেন পড়শিরাও। ৩৭ বছর পর যে মিলিয়ে দিয়েছে এসআইআর। মিষ্টি মুখে, আর এলাকার মানুষের ফুল, পুষ্প স্তবকের সংবর্ধনায়, অভ্যর্থনায় একেবারে খুশির জোয়ার ওই পরিবারে। আর যার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে প্রশাসনও। বেশ কিছুক্ষণ বাস্তুভিটেতে কাটিয়ে রঘুনাথপুর দুই ব্লকের বিডিওর সঙ্গে দেখা করতে যান বিবেকবাবু। আর এই ঘটনায় রঘুনাথপুর মহকুমা শাসক বিবেক পঙ্কজ বলেন, ‘‘এটাই শিকড়ের টান। এসআইআর মিলিয়ে দিল ৩৭ বছর পর।’’

    ১৯৮৮ সাল থেকেই বিবেক চক্রবর্তী ঝাড়খণ্ডের সিন্দরিতে একটি কোম্পানিতে কাজ করতেন। হঠাৎ করেই পরিবারের সঙ্গে অভিমানে ১৯৯০-৯১ সাল নাগাদ তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান। কী কারণ? বাবার সঙ্গে অভিমান না অন্য কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে যান বিবেকবাবু। খানিকটা আনমনা হয়ে বলেন, ‘‘না ওই কথা কিছু বলব না। পুরনো কথা থাক। এখন আগামী ১০টা দিন শুধু পরিবারের সঙ্গে কাটাব।’’ কিন্তু ৩৭ বছর কেমন ছিল? ভিটে বাড়ির খাটিয়ায় বসে একটু একটু করে ভাঙছিলেন বিবেকবাবু। তাঁর কথায় ঘর ছেড়ে আমি ওড়িশায় চলে গিয়েছিলাম। সিন্দ্রির যে কোম্পানিতে কাজ করতাম সেখানেই ওই কোম্পানির শাখা ছিল। কিন্তু ওখানে আর কাজ করতে ভালো না লাগায় দু’বছর পর কলকাতায় চলে যাই। কলকাতায় গিয়েই জীবনের সঙ্গে ভীষণ লড়াই। প্রায় দুটো বছর লড়াই করে চলতে হয়েছে। তারপর টাকা জমিয়ে প্রোমোটিংয়ের ব্যবসা শুরু করি। টিউশনও পড়াতাম দমদমে। ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। টিউশন পড়াতে গিয়েই ছাত্রীর মাসির সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে করেছি।’’

    নদিয়ার কৃষ্ণনগরের মেয়ে সুপ্রিয়া চক্রবর্তীর সঙ্গে ঘর বাধার পর সন্তান আসে তাঁদের জীবনে। তারপর সুখেই দিন কাটছিল। গত বছর দমদমে নতুন ফ্ল্যাটও কিনেছেন। স্বামীর মুখে শ্বশুরবাড়ির কথা শুনে সুপ্রিয়া দেবী বহুবার গ্রামের বাড়িতে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু বিবেকবাবু আর ফেরেননি। এই এসআইআর (SIR in Bengal) প্রক্রিয়ায় ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ঠাকুরদার নাম রয়েছে কিনা তা জানতে বিবেকবাবুর ছেলে বিশাল চক্রবর্তী ওয়েবসাইট থেকে গোবরান্দা গ্রামের বিএলওর নাম নিয়ে ফোনে তথ্য জানতেই সব সামনে চলে আসে। বিএলও যে তার আপন কাকা। আর তারপর মিলেমিশে যান তারা। ৩৭ বছরের বিচ্ছেদ দূর হয়ে খুশি আসে জীবনে। ছোট ভাই প্রদীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘বিএলও না হলে দাদার সঙ্গে কোনদিনও দেখা হত কিনা জানি না।’’ দুই বোন জানান, এবার দাদাকে তাঁরা শেকল দিয়ে বেঁধে রাখবেন। পড়শিরা বলেন, ‘‘বিশালের বিয়েতে তাঁরা দমদম যাবেন। তখন বিবেকবাবু জানান, “তাঁর ছেলের বিয়ে এই বাস্তুভিটেতেই হবে।’’
  • Link to this news (প্রতিদিন)