• মাফ করুন, সগুনে এক টাকা নিয়ে পাত্র ফেরাল ৩১ লক্ষ পণ
    এই সময় | ২৯ নভেম্বর ২০২৫
  • লখনৌ: ‘আমাকে ক্ষমা করবেন, এ আমি নিতে পারব না’ — ঘরভর্তি অতিথির সামনে হাতজোড় করে পাত্রের এমন কথায় পিন পড়ার নিস্তব্ধতা। তাঁর সামনে একটি সুন্দর করে সাজানো থালায় রাখা ৬২০০টি ৫০০ টাকার চকচকে নোট — অর্থাৎ ৩১ লক্ষ টাকা। তা হলে কি সে টাকাও কম পড়ল! মুখ চাওয়াচায়ি করছেন অতিথি–অভ্যাগতরা। সে দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই অবদেশ রানার। বছর ২৬–এর তরুণ বলছেন, ‘না না, এ তো ওঁর (পাত্রী) বাবার বহু দিনের কষ্টের সঞ্চয়। সেটার উপরে আমার কোনও অধিকারই নেই। আমি পণ নিতে পারব না। আমায় মাফ করুন।’ বলে কী ছেলে! এমন তো দস্তুর নয়। বরং এক টাকাও কম থাকলে অনেক সময়ে বরকে বিয়ের আসর থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। আবার কখনও টাকার অঙ্ক পছন্দ না হলে বিয়েতে বসাতেই চায় না পাত্রপক্ষ। তখনও ক্কদাচিৎ কোনও প্রতিবাদ দেখা যায়। সে জায়গায় এ তো যেন প্রবল খরার মধ্যে এক পশলা হঠাৎ বৃষ্টি! তবে বড়দের আশীর্বাদ বা শগুন হিসেবে অবদেশ সেই থালা থেকে এক টাকার কয়েনটি তুলে নিয়েছেন।

    উত্তরপ্রদেশের মুজফ্‌ফরনগরের এই তরুণের কসমেটিক্স–এর ব্যবসা রয়েছে। সুখপাল সিং তাঁর সঙ্গে নিজের নাতনি অদিতি সিংয়ের বিয়ে ঠিক করেন। কোভিডে বাবাকে হারিয়েছেন অদিতি। ফলে ছেলেমেয়েকে নিয়ে তাঁর মা সীমা তার পর থেকেই থাকছিলেন তাঁর বাবার কাছে শাহবুদ্দিন গ্রামে। অদিতি এমএসসি শেষ করার পরেই অবদেশের সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ পাকা করেন সুখপাল। তবে বাপ–মরা নাতনির বিয়েতে যাতে কোনও ‘খামতি’ না থাকে সে জন্য সুখপাল তো বটেই, মেয়ের নামে বাবা যা সঞ্চয় রেখে গিয়েছিলেন তা–ও এই বিয়েতে খরচ করার সিদ্ধান্ত নেন সকলে। সেই মতোই ‘শগুন’ হিসেবে ৩১ লক্ষ টাকার আয়োজন! বাঙালি বিয়ের আসরে এত নগদ টাকা দেওয়ার চল না থাকলেও হিন্দি বলয়ের বিয়েতে এটা খুবই ‘কমন প্র্যাক্টিস।’ অনেক সময়ে পাত্রের গলায় টাকার মালাও পরিয়ে দেওয়া হয়। তাই অদিতির বিয়েতে এমন আয়োজন অবাক হওয়ার মতো নয় মোটেই। বরং স্রোতের বিপরীতে গিয়ে অবদেশই সকলকে চমকে দিয়েছেন।

    এই তরুণ ব্যবসায়ী অদিতির দাদু ও মাকে বলেন, ‘আমি আশীর্বাদের নামে এত টাকা পণ নেব না। আমি যে কোনও রকম দহেজ (পণ)–এর বিরুদ্ধে। কেন আমি অন্য একজনের কষ্টের সঞ্চয় নিয়ে নেব?’ তাঁর মা–বাবাও ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘ও তো ঠিকই বলছে। আমরা কোনও পণ চাই না। চাইনি। দু’জন মানুষ ও দুই পরিবারের সম্পর্ক িক টাকা দিয়ে কেনা যায়!’ তাঁরা জানান, অদিতির বাড়ি থেকে এমন আয়োজন করা হচ্ছে জানতে পারলে তাঁরা আগেই তাঁদের আপত্তির কথা জানিয়ে দিতেন। অবদেশ একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘২২ তারিখ আমাদের বিয়ে ছিল। সেখানেই শগুন হিসেবে আমায় এই টাকা দেওয়া হয়েছিল। আমি তা ফিরিয়ে দিয়েছি।’

    অবদেশের এই প্রতিবাদের পর থেকে সেই জেলায় এখন এই একটাই আলোচনা। এক গ্রামবাসী বললেন, ‘আমাদের দামাদজি (জামাই) যে ভাবে সমাজের এই কুপ্রথার বিরোধিতা করেছেন, তা ভোলার নয়।’ আর এক জন মনে করছেন, অবদেশ এই সমাজের উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তাঁর দেখানো রাস্তায় যদি তরুণরা চলেন, তা হলে বহু মেয়ের জীবনের অন্ধকার কেটে যাবে। তাঁদের মা–বাবাদের চিন্তা দূর হবে। আর কী বলছেন অদিতি? সব আচার মেনে বিয়ে হওয়ার পরে তিনি এখন শ্বশুরবাড়িতে। দেখেছেন অবদেশের ‘পণ–প্রতিবাদ।’ খুব নিচু স্বরে বললেন, ‘আমার মা ও দাদু ওঁর এমন সিদ্ধান্তে মুগ্ধ। কিন্তু এটাই তো সব ক্ষেত্রে হওয়া উচিত, তাই না?’

    এই উদাহরণ তুলে ধরে কি পণপ্রথা–বিরোধী এক নতুন সমাজ গড়ার প্রতিজ্ঞা করবে তরুণদল? তার উত্তর ভবিষ্যৎ–ই দেবে।

  • Link to this news (এই সময়)