শিলাদিত্য সাহা
কাশীর গলি মনে করিয়ে দেওয়ার মতো সরু একটা রাস্তা। তার ঠিক বাইরেই জ্বলজ্বল করছে ব্যানারটা। হরেক ছবির কোলাজে ভরা, এতটাই জীবন্ত যে হঠাৎ মনে হবে ফ্রেম থেকে বেরিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে বলবেন, 'আপনাকে তো কাল্টিভেট করতে হচ্ছে মশাই!' দিনটা ছিল ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮। ঠিকানা, আমহার্স্ট রো। কলকাতা ৭০০০০৯। এই গলিটার মুখেই সেদিন বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন কথাটা। 'সন্তোষ চলে গেল। আমি আর ফেলুদা করব না।'
বাঙালির সেই জটায়ু, রিলের বাইরে রিয়েল লাইফে দুদে ক্রিমিনাল ল'ইয়ার সন্তোষ দত্ত বেঁচে থাকলে শতবর্ষে পা রাখতেন আগামী ২ ডিসেম্বর। আজও টেলিভিশনে 'সোনার কেল্লা', 'জয় বাবা ফেলুনাথ' দিলে কাজ ফেলে বসে পড়েন না, এমন মানুষ বিরল। কিন্তু পর্দার বাইরে সন্তোষ দত্তকে মনে রেখেছেন কতজন? কেনই বা কলকাতা শহরে এত উদযাপনের ভিড়ে আজও একটা মূর্তি নেই লালমোহন গাঙ্গুলির? আশার কথা, তাঁর প্রতিবেশীরা আজও মনের মণিকোঠায় সযত্নে লালন করছেন সন্তোষের স্মৃতি।
তাই তাঁর জন্মশতবর্ষের সূচনায় তাঁর বড় হয়ে ওঠা পাড়াতেই এ বার মূর্তি বসছে জটায়ুর। তবে ঠিক জটায়ুর নয়, মূর্তি বসছে আমহার্স্ট রো-র বাসিন্দা, অভিনেতা তথা আইনজীবী সন্তোষ দত্তর। যাঁর গোঁফ ছিল না, যিনি কথায় কথায় লোককে হাসিয়ে দিতেন না। যাঁর গম্ভীর মুখ দেখে কেউ হাততালি দিয়ে 'আরিব্বাস' বলার সাহস দেখাত না।
জন্ম তাঁর অবিভক্ত বঙ্গদেশের ঢাকায়। কিন্তু মাত্র সাত বছর বয়সেই বাবার হাত ধরে সন্তোষ চলে আসেন কলকাতা, ৪৯ আমহার্স্ট রো-র বাড়িতে। তার পরে আমৃত্যু বসবাস সেই 'সুরধ্বনি কুটীর'-এ। গলির ঠিক উল্টো দিকেই বাড়ি কলকাতা পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কনস্টেবল অমল ঘোষের। স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করে প্রিয় 'সন্তোষদা'। তাই ছেলে অরিজিতের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন একটা ছোট্ট সংগঠন 'আমাদের প্রয়াস'। সেই সংগঠনের উদ্যোগেই শতবর্ষে পাড়ায় 'ফিরছেন' সন্তোষ। পাড়ার দুর্গাপুজো, টিকিয়াপাড়া সর্বজনীনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিলের জটায়ু। এ বার ১২১ বছরের সেই পুজোর উদ্যোক্তারাও সামিল হয়েছেন প্রয়াসে। সঙ্গে পেয়েছেন রোটারি ক্লাবকে।
অমলের কথায়, 'আমরা পাড়ার বেকার ছেলেরা দাদা ডাকতুম। পুলিশে যখন চাকরি পাই, আমার রেকমেন্ডেশন লেটারে সই করেছিলেন সন্তোষদা। তার আগে এপিক থিয়েটার গ্রুপে অভিনয় করতাম। পাড়ায় দেখা হলে জানতে চাইতেন, 'কী অভিনয় করছিস? কদ্দুর এগোল?' নিজেও পাড়ায় পুজোর সময়ে নাটক-যাত্রায় অভিনয় করতেন। মজার কথা, সন্তোষদা নিতেন কোনও মহিলা চরিত্র। সঙ্গে থাকতেন পাড়ারই রবীন্দ্রনাথ রায়, মণীন্দ্র মজুমদাররা। আশির দশকের শুরুর দিকটায় পাড়ায় ওঁর বাড়িতেই প্রথম টেলিভিশন আসে। পাড়ার কমবয়সি ছেলেরা দিব্যি খেলা দেখতে যেত ওঁর বিশাল ঘরটায়। সেটাই সকালে ছিল চেম্বার। চোখে মোটা চশমা, হাতে পাইপ সেই সন্তোষ দত্তর সঙ্গে রিলের জটায়ুর কোনও মিলই নেই।'
'সকালে বাড়ির সামনে ওঁর তৎকালীন জুনিয়র অশোক বক্সীর গাড়ি এসে দাঁড়াত। অশোকদা গলি দিয়ে বাড়ি গিয়ে পুজোর ফুল এনে রাখতেন গাড়ির ড্যাশবোর্ডে। তার পরেই সন্তোষদা উকিলের পোশাক পরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা গাড়িতে। ওঁর বিয়ের পরে প্রথম খাওয়াদাওয়া হয়েছিল আমাদের বাড়ির ছাদে। উত্তম কুমার, সৌমিত্র, রবি ঘোষকে তখন মালকোঁচা দেওয়া ধুতি পরে বারান্দায় সুখটান দিতে দেখেছি। কাজের বাইরে সন্তোষদার মেজাজ কিন্তু বেশ হাসিখুশি থাকত'- স্মৃতিচারণে বলছিলেন অমল। ঘটনা হলো, 'সোনার কেল্লা'র শুটিংয়ের ফাঁকেও মামলার কাগজ পড়তেন সন্তোষ। 'অ্যাকশন' বলতেই যাঁর মুখ দিয়ে 'তং মত করো' বেরোচ্ছে, 'কাট' শোনার পরেই তিনি মুখ গুঁজছেন আইনের মোটা বইয়ে।
'জয়বাবা ফেলুনাথ'-এ মলয় রায়ের হাতের গুলি দেখে যে জটায়ু হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন, একটা বয়সের পরে ফিট থাকতে সেই সন্তোষই দ্বারস্থ হয়েছিলেন পাড়ার আর এক বিখ্যাত ব্যক্তির। আয়রনম্যান নীলমণি দাস। প্রতি রবিবার নিয়ম করে সন্তোষ যেতেন ব্যায়াম করতে। প্রয়াত নীলমণির ছেলে, স্বপন কুমার দাসের কথায়, 'বাবার বলে দেওয়া ব্যায়াম, আসনগুলো আমিই ওঁকে দেখিয়ে দিতাম। উনি সেগুলো মন দিয়ে চর্চা করতেন। সেটা ১৯৮০-৮১ সাল। পরে বেশ কয়েক বছর উনি সেই ব্যায়ামচর্চা জারি রেখেছিলেন।' অথচ কয়েক বছর আগে সন্তোষ দত্তর বাড়িটি বিক্রির সময়ে কত মণিমুক্তো যে হারিয়ে গিয়েছে, জানা নেই।
আমাদের প্রয়াস-এর সদস্য অরিজিতের কথায়, 'সন্তোষ জেঠুর চেম্বারে বড় চেয়ারটায় যে ছবিটা রাখা থাকত, সেটা সে দিন গলির মুখে রাস্তায় পড়েছিল। তুলে এনেছিলাম। ওঁর চেয়ারটা দেখলাম বিক্রি হয়ে গেল ১০০ টাকায়। একজন মাথায় চাপিয়ে নিয়ে চলে গেল। তা-ও সোনার কেল্লার পরে ওঁর সেরা অভিনেতার পুরস্কার পাওয়ার একটা সার্টিফিকেট রেখে দিতে পেরেছি।' নাটকের মঞ্চ থেকে সন্তোষকে রিলের দুনিয়ায় এনেছিলেন সত্যজিৎ। প্রথম ছবি, 'পরশপাথর'। আর পাড়ায় বসাতে চলা মূর্তিকে প্রতিবেশী সন্তোষ দত্তের আদলে করার বুদ্ধিটা দিয়েছেন তাঁর পুত্র, সন্দীপ রায়। অরিজিতের কথায়, 'সন্দীপবাবু বললেন, একদিন তোমায় পাঞ্জাবি পরে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে বলে ওটাই 'অরিজিনাল' তুমি নও তো। তা হলে পাড়ার লোকে সন্তোষদাকে যে ভাবে চিনতেন, সেই চেনাটাই রাখো।'
প্রতিবেশী সন্তোষের মূর্তি বানাচ্ছেন শিল্পী অমল পাল। ঘটনা হলো, তাঁর দাদু জিতেন পালের তৈরি দুর্গামূর্তিই আমরা দেখেছি সত্যজিতের সব ছবিতে। জয় বাবা ফেলুনাথের সেই বিখ্যাত দুর্গামূর্তিও প্রয়াত জিতেনের হাতে তৈরি। ২ ডিসেম্বর বেদীতে বসিয়ে সেই মূর্তির উন্মোচন। পাড়ায় ফিরছেন সন্তোষদা।