আজকাল ওয়েবডেস্ক: গত বেশ কিছুদিন ধরেই রাজ্য জুড়ে পারদ কিছুটা নিম্নমুখী। সকাল হলেই কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে গ্রাম বাংলা। শীতের পোশাক গায়ে দিয়ে মুর্শিদাবাদের গ্রামাঞ্চলের পথ দিয়ে সকালবেলায় হেঁটে গেলে যে কেউ এখন পেতে পারেন খেজুরের রস ফোটানোর মিষ্টি গন্ধ।
মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা, লালবাগ, জিয়াগঞ্জ, ভগবানগোলা, রানিনগর, জঙ্গিপুর, সামশেরগঞ্জ, কান্দি-সহ একাধিক এলাকার গ্রামগুলোতে শীতের সকালে রোজ কয়েকশ ব্যক্তি তৈরি করেন জেলার বিখ্যাত পাটালি গুড়।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খেজুরের রস থেকে পাটালি গুড় তৈরি হলেও সেই নবাবী আমল থেকে খেজুর গাছের রস দিয়ে তৈরি বিশেষ স্বাদের মুর্শিদাবাদের পাটালি গুড়ের ঐতিহ্য আজও অমলিন রয়ে গিয়েছে।
তবে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে গ্রাম বাংলায় খেজুর গাছের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকায় এবং নকল পাটালি গুড়ে বাজার ভরে যাওয়ায় আসল পাটালি গুড় এখন বেশিরভাগ মানুষই খেতে পান না। মুর্শিদাবাদের লালবাগের পীরতলা এলাকার বাসিন্দা বৈদ্যনাথ মণ্ডল বলেন, "খেজুর গাছের রস সংগ্রহের জন্য হাড়ি বাঁধা থেকে শুরু করে পাটালি গুড় তৈরি করতে কমপক্ষে ১২ -১৫ ঘণ্টা সময় লাগে।"
পাটালি গুড় তৈরি করার জন্য রোজ বিকালে খেজুর গাছে মাটির হাঁড়ি লাগিয়ে দেওয়া হয়। রসের গুণমান যাতে ঠিক থাকে সেই কারণে হাঁড়িতে কিছুটা চুন দিয়ে রাখতে হয়। এতে রস ঘোলা হয়ে যায় না।
মুর্শিদাবাদের কয়েকজন পাটালি গুড় উৎপাদক বলেন, একটি খেজুর গাছ থেকে পরপর ৪-৫ দিন রস সংগ্রহ করা হয়। একটি গাছ থেকে ৪-৫ লিটার রস পাওয়া যায়। এইভাবে কয়েকদিন রস সংগ্রহ করার পর গাছকে ৪-৫ দিন বিশ্রাম দেওয়া হয়।
গাছে হাঁড়ি লাগানোর পরদিন ভোরবেলায় গুড় উৎপাদকরা রস সংগ্রহ করে নিয়ে এসে বড় পাত্রে জাল দেন। গুড় উৎপাদকদের বাড়িতে ১০ লিটার থেকে শুরু করে একেবারে ৭০-৮০ লিটার পর্যন্ত খেজুরের রস জাল দেওয়া যেতে পারে এমন বড় বড় পাত্র রয়েছে।
তবে খাঁটি পাটালি গুড় তৈরির জন্য এখনও জ্বালানি হিসেবে কেবলমাত্র কাঠ ব্যবহার করা হয়।
বৈদ্যনাথবাবু বলেন, "খাঁটি পাটালি গুড় তৈরি করার জন্য একজন উৎপাদকে বিপুল পরিশ্রম করতে হয়। ১০ লিটার খেজুরের রসকে ক্রমাগত দু'ঘণ্টা কাঠের উনুনে জাল দেওয়ার পর তা থেকে দু'কেজি খাঁটি পাটালি গুড় তৈরি করা সম্ভব। তবে খাঁটি পাটালি গুড় তৈরি করার জন্য উৎপাদকের অভিজ্ঞতা থাকাও দরকার। খেজুরের রস ফুটে গাঢ় হতে থাকলে প্রথমে তাতে 'সর্ষে ফুট', তারপরে 'কদমা ফুট ' ধরে। এরপরই উৎপাদককে হাতে বা ঠান্ডা জলে গাঢ় খেজুরের রসের কয়েক ফোঁটা ফেলে বুঝে নিতে হয় তা পাটালি গুড় তৈরির জন্য উপযুক্ত হয়েছে কি না।"
গুড় উৎপাদকরা বলেন, খেজুরের রস ফুটিয়ে পাটালি গুড় তৈরি করার জন্য তাতে অন্য কিছু মেশাতে হয় না। খেজুরের রস ফুটে গাঢ় হলে তা কিছুটা কালো হয়ে যায়। সেই কারণে ওই গাঢ় রস পাত্রে দেওয়ার আগে কিছুটা অংশ আলাদা করে পরিষ্কার করা হয়। এরপর সেই অংশটা বাকি গাঢ় রসের সঙ্গে মিশিয়ে পাটালি গুড় তৈরির জন্য বিভিন্ন পাত্রে ঢেলে দেওয়া হয়। প্রায় ৩০ মিনিট ঠান্ডা হলে ওই গাঢ় রস জমে গিয়ে পাটালি গুড় হয়ে যায়।
মুর্শিদাবাদ জেলার বেশ কিছু পাটালি গুড় উৎপাদক জানিয়েছেন, আসল পাটালি গুড়ের দাম খুব বেশি হওয়ার কারণে বাজারে এখন ভেজাল পাটালি গুড়ের চাহিদাই বেশি। ভেজাল পাটালি গুড় তৈরি করার জন্য খেজুরের রসের সঙ্গে উৎপাদকরা চিনি মিশিয়ে দেন।
বৈদ্যনাথ মণ্ডল বলেন, "দু'জন উৎপাদক সারাদিন পরিশ্রম করে মাত্র ২০-৩০ কেজি খাঁটি পাটালি গুড় তৈরি করতে পারবেন। অন্যদিকে ওই একই সময়ে প্রায় ৭০-৮০ কেজি চিনি মেশানো পাটালি গুড় তৈরি করা সম্ভব।"
তিনি বলেন, "বাজারে খাঁটি পাটালি গুড়ের দাম পাইকারি বাজারে কেজি প্রতি প্রায় ২০০-২৫০ টাকা। সেখানে চিনি মেশানো পাটালি গুড় ১০০ -১৫০ টাকায় পাওয়া সম্ভব। তাই লোকজন না বুঝেই চিনি মেশানো পাটালি গুড় বেশি করে খান।"
গুড় উৎপাদকদের অভিজ্ঞতায়, আসল পাটলি গুড় একটু নরম হয়। কিন্তু চিনি মেশানো পাটলি গুড় প্রচন্ড শক্ত হয়। এই গুড় মাটিতে জোড়ে ছুড়লে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। যদিও খাঁটি পাটালি গুড় মাটিতে ছুড়ে মারলে তা কিছুটা থেবড়ে বসে যাবে।
মুর্শিদাবাদের পাটলি গুড় উৎপাদকরা জানান, স্বাদের জন্য জেলার এই গুড়ের চাহিদা রাজ্য জুড়ে এবং রাজ্যের বাইরে থাকলেও কাঠ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে তাঁদের লাভ দিনকে দিন কমছে। তার ফলে খাঁটি পাটলি গুড় উৎপাদকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। গুড় ব্যবসায়ীরা কেবলমাত্র অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত এই কাজের সঙ্গে জড়িত থাকেন। বাকি সারা বছর তাঁদের চাষবাস করে পরিবার সামলাতে হয়।
এবছর শীত পড়তেই লালবাগ, পীরতলা, রামরাজাপুর, হৈদরপুর, বেলেপাড়া-সহ আরও একাধিক গ্রামে পাটালি গুড় উৎপাদকরা নিজেদের বাড়ি থেকেই খাঁটি গুড় বিক্রি শুরু করেছেন। তাই খেজুর রসের তৈরির খাঁটি পাটালি গুড় খাওয়ার ইচ্ছা থাকলে এবার শীতে একবার ঢুঁ মেরে যেতেই পারেন নবাবের এই জেলায়।