এই সময়: একরকম আড়ালে থাকা ঐতিহাসিক খাদ্য-সংস্কৃতির সন্ধানে শনিবার সন্ধেয় জনা ৫০ কৌতূহলী মানুষ হেঁটে বেড়ালেন খিদিরপুর, একবালপুর, মোমিনপুরের অলিগলিতে। ‘নো ইওর নেবার’, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ’-এর সম্মিলিত উদ্যোগে আয়োজিত এই ‘বিরিয়ানি অ্যান্ড বিয়ন্ড’ পদযাত্রার লক্ষ্য, অঞ্চলের সমৃদ্ধশালী বৈচিত্র তুলে ধরে সম্প্রীতির বার্তা দেওয়া।
ঐতিহাসিক ভাবে একটা সময়ে পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান ডকইয়ার্ডের অবস্থান ও বহু অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বাসস্থান ছিল খিদিরপুরে। অঞ্চলটি মুসলিম-প্রধান হলেও সেখানে থাকতেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। যাঁর সূত্রে ওই এলাকা ‘কবিতীর্থ’ নামেও পরিচিত। বিভিন্ন জাতির সহাবস্থানের খুব ভালো উদাহরণ ওই এলাকা— এমনটাই অনেকে মনে করেন।
নো ইওর নেবার-এর সাবির আহমেদ জানান, অওধের শেষ নবাব ওয়াজ়েদ আলি শাহের আগমন বাংলার খাদ্য–সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। সেই অওধি বিরিয়ানিকে স্বতন্ত্র রূপ দেয় আলু। যার ফলে আলু দেওয়া বিরিয়ানি ‘কলকাতা বিরিয়ানি’ হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তোলে।
তা ছাড়া, সেখানকার খাদ্য সম্ভারের তালিকায় থাকা বাকরখানি রুটি, নোনতাখাজি, হালুয়া–পুরি, জার্মান ব্রেড, শীতের নেহারি ও পায়া— বিভিন্ন সংস্কৃতির মিশেলে গড়ে উঠেছে। এ দিন সে সব চেখে দেখলেন ও খাবারের ঠেকগুলো ঘুরে দেখলেন আগ্রহীরা।
যাত্রাপথে পঞ্চুবাবুর শপ, তালের বড়ার জন্য বিখ্যাত দীপালি কেবিন, কাচ্চি বিরিয়ানির জন্য পরিচিত শীস মহল, বছরভর হালিম বিক্রি করা ফ্যান্সি হালিম স্টল, হাজি আলাউদ্দিন ও জ়াইকা কাবাব এবং শতাব্দী প্রাচীন কে আলি বেকারিতে ঢুঁ মারেন তাঁরা।
নো ইওর নেবার-এর সদস্য রুবাইদ নস্কর জানাচ্ছেন, জার্মান ব্রেডের ইতিহাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। এর শক্ত খোলস এবং পুষ্টিকর উপাদান ব্ল্যাকআউটের সময়ে মানুষের খিদে মেটাত। আবার, বাকরখানি মুঘল ঐতিহ্যের খাবার হলেও এর নাম বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র অধীন সামরিক কম্যান্ডার আগা বাকর খান এবং নৃত্যশিল্পী খানি বেগমের করুণ প্রেমের কাহিনির সঙ্গে ওতপ্রোত। সেই বিষয়টিও তুলে ধরা হয় শনিবারের ওয়াকে।
টাকি গভর্নমেন্ট কলেজের অধ্যাপক অন্তরা মুখোপাধ্যায়ের সাফ কথা, ‘অনেকেরই ধারণা, এলাকাটি নেহাতই এক মুসলিম বস্তি। এবং এই ধারণা সর্বৈব ভুল। খাবারের প্রতি মানুষের সম্মিলিত আবেগ এই অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে। যার শুরু উনিশ শতকের শেষে।’
এ দিনের পদযাত্রা সম্প্রীতি ও ঐক্যের বার্তাই দিল বলে জানান যোগদাতারা।