আজকাল ওয়েবডেস্ক: এসআইআর-এর ঠেলায় প্রায় ৭০ বছর বয়সে এসে মুর্শিদাবাদের লালগোলা থানার দেওয়ানসরাই গ্রাম পঞ্চায়েতের মৃদাদপুর গ্রামের বাসিন্দা নূরাল শেখ জানতে পারলেন তিনি এক পুত্র সন্তানের 'বাবা' হয়েছেন! তবে অদ্ভুতভাবে 'সদ্যজাত' সেই সন্তানের বয়স এখন প্রায় ৪০ বছর।
তিন মেয়ে দুই ছেলে বাদ দিয়েও নূরালের যে আরও এক সন্তান ছিল এই কথা এতদিন 'গোপন' রাখার জন্য তাঁর বাড়িতে এখন প্রায় রোজই অশান্তি হচ্ছে । গ্রামের বাসিন্দারা আড়ালে আবডালে বলছেন, ভাগ্যিস এসআইআর-এর আগেই নূরালের স্ত্রী মারা গিয়েছেন। না হলে বৃদ্ধ বয়সে স্বামীর এই 'কুকীর্তি'র কথা জানতে পেরে হয়তো সে শোকেই মূহ্যমান হতেন। তবে যে সন্তানকে নিয়ে নূরালের বাড়িতে এখন অশান্তির মেঘ জমেছে এসআইআর-এর ফর্ম জমা করার পর থেকে তাকে আর গ্রামে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। নূরালের 'সদ্যজাত' সন্তান বাবু শেখ কোথায় রয়েছে, সন্ধান দিতে পারেননি তার গর্ভবতী স্ত্রীও। বাড়িতে নিজের তিন সন্তানকে নিয়ে গভীর অত্যান্তরে পড়েছেন ওই মহিলা।
মৃদাদপুর গ্রামের বাসিন্দা নূরাল শেখের তিন মেয়ে দুই ছেলের মধ্যে প্রায় সকলেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। মেয়েরা অন্য গ্রামে থাকলেও ছেলেরা তাঁর সঙ্গেই থাকেন। রাজ্যজুড়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর সম্প্রতি কয়েকটি সূত্র থেকে নূরাল জানতে পারেন ওই গ্রামের এই বাসিন্দা বাবু শেখ নামে এক বছর ৪০- এর ব্যক্তি তাঁকে নিজের বাবা বানিয়ে এসআইআর ফর্ম জমা করে দিয়েছেন।
নূরালের বাড়ির লোকেরা এই খবর জানার পর থেকে তাঁর সঙ্গে অশান্তি করে দিয়ে শুরু করেছেন। সূত্রের খবর নূরালের সম্পত্তির ভাগ আরও এক 'ছেলে'কে দিতে হবে এই কারণেই নূরালের ৫ সন্তানের সঙ্গে তাঁর অশান্তি শুরু হয়েছে। প্রায় ৭০ বছর বয়সী ওই প্রৌঢ় কাউকেই বুঝিয়ে পারছেন না বাবু শেখ নামে তাঁর কোনওদিনই কোনও সন্তান ছিল না, এখনও নেই।রাজ্য জুড়ে এসআইআর হওয়ার পর কীভাবে এই সন্তানের জন্ম হল তা নিয়ে তিনিও গভীর চিন্তার মধ্যে রয়েছেন! নূরাল বলেন, "আমাদের গ্রামে বাবু শেখ নামে একটি ছেলে রয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে আমার এবং পরিবারের কোনও সম্পর্ক নেই ।কীভাবে যে আমি তার 'বাবা' হয়ে গেলাম তা বুঝতে পারছি না। "
তিনি বলেন, "এসআইআর শুরু হওয়ার পর আমার নাম ব্যবহার করে ওই ছেলেটি আমাকে বাবা বানিয়ে তার এনুমারেশন ফর্ম জমা করেছে বলে আমি শুনেছি। আমি বিএলও-কে জানিয়ে দিয়েছি বাবু শেখ আমার সন্তান নন। আমি চাই মিথ্যে তথ্য দেওয়ার জন্য ওই যুবকের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিক। "
মৃদাদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক তথা ৭৬ নম্বর পার্টের বিএলও সরোজ হালদার বলেন, "সাম্প্রতিক ভোটার তালিকায় বাবু শেখের নাম রয়েছে এবং সেই কারণেই তার নামে এসআইআর ফর্ম ইস্যু হয়েছে। ওই ব্যক্তি ইতিমধ্যেই তার এসআইয়ের ফর্ম আমার কাছে জমা করে দিয়েছেন। "
ওই বিএলও বলেন, "যে নূরাল শেখ এখন অস্বীকার করছেন বাবু শেখ তাঁর সন্তান নয় তাঁকেই ওই ব্যক্তি বাবা বানিয়ে নিজের এসআইআর ফর্ম জমা করেছেন। এই ঘটনা নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর আমি গোটা বিষয়টি ইতিমধ্যেই বিডিও-কে জানিয়েছি। ভবিষ্যতে তাঁরা যে নির্দেশ দেবেন সেই অনুযায়ী কাজ করা হবে।"
তবে মৃদাদপুরের কিছু গ্রামবাসী নাম না প্রকাশের শর্তে জানেন, বাবু শেখ দীর্ঘদিন ধরেই ওই গ্রামে বসবাস করছেন। গ্রামবাসীদের অনেকের দাবি, একসময় নূরাল শেখের পরিবারকে টাকা দিয়ে তাঁদের সম্মতিতেই বাবু শেখ, নূরালকে বাবা বানিয়ে নিজের ভুয়ো নথি তৈরি করেছিল। কিন্তু এসআইআর শুরু হওয়ার পর নূরালের ছেলে-মেয়েদেরকে কেউ বা কারা বুঝিয়েছে, এসআইআর-এর নথিতে যদি বাবু শেখের বাবা হিসেবে নূরালের নাম থেকে যায় তাহলে তাকে ভবিষ্যতে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে। এই কারণে নূরালের ছেলে মেয়েরাই এখন বাবু শেখের প্রকৃত তথ্য সকলের সামনে এনে দিয়েছে। এই ঘটনার পর বাবু শেখের বক্তব্য জানার জন্য তাঁর বাড়িতে যাওয়া হলেও সেখানে তাঁকে পাওয়া যায়নি। ওই যুবকের স্ত্রী সাজেমা বিবি বলেন ,"আমি নিজে ৮ মাসের গর্ভবতী। আমার আরও তিন সন্তান রয়েছে। এসআইআর-এর পর আমাদেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলে কোথায় যাব জানিনা।"লালগোলার তৃণমূল বিধায়ক মহম্মদ আলী বলেন, "রাজ্য জুড়ে এসআইআর-এর যে অনুশীলন চলছে তাতে লালগোলায় বেশ ভালো অগ্রগতি হয়েছে। এই আবহে কিছু ঘটনা সামনে উঠে আসছে। এসআইআর-এর শুনানি শুরু হলে এই সমস্যাগুলো সম্ভবত সমাধান হয়ে যাবে। "