• ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’– নির্বাচনের আগে সংগঠন পুনর্গঠন
    আজকাল | ৩০ নভেম্বর ২০২৫
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) কার্যক্রম শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। আর এই সুযোগকেই সংগঠন পুনর্গঠনের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কাজে লাগাতে কোমর বেঁধে নেমেছে সিপিআই(এম)। গত বিধানসভা নির্বাচনে একটিও আসন না পাওয়ার পর, দীর্ঘ রাজনৈতিক রক্তক্ষয়ের পর্ব কাটিয়ে দলকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে এবার মাঠে নামছে তারা— ভোটার তালিকা সংশোধন অভিযান থেকে রাজ্যজুড়ে গণসংযোগ, সবেতেই ফোকাস CPI(M)-এর।

    ৩৫,০০০-এর বেশি বুথ লেভেল এজেন্ট (BLA)

    নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩৫,৭৪৮ জন বুথ লেভেল এজেন্ট নিয়োগ করেছে সিপিআই(এম), যা তৃণমূল  (৫৪,৩১০) ও বিজেপি (৪৮,৬৫৩)-এর পর তৃতীয় বৃহত্তম সংখ্যক প্রতিনিধি। দলীয় সূত্রে খবর—দুর্বল সংগঠনিক এলাকায় সশরীরে BLA পাঠানো কঠিন, তাই বহু অঞ্চলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে হোয়াটসঅ্যাপ ও ফোনকলের মাধ্যমে ফর্ম পূরণের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন দল সংগঠিত এলাকাগুলিতে ভোট সংশোধন শিবির ও সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে।

    ১,০০০ কিলোমিটার পথচলা—‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’

    এই সংগঠনমূলক উদ্যোগের পাশাপাশি সিপিএম ঘোষণা করেছে ১,০০০ কিলোমিটার পথযাত্রা—‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’। এই যাত্রা শুরু হয়েছে ২৯ নভেম্বর তুফানগঞ্জ থেকে এবং ১৭ ডিসেম্বর কামারহাটিতে শেষ হবে। ১৯ দিনে ১১ জেলার মধ্য দিয়ে যাবে যাত্রা।

    পরিক্রমার অন্তর্ভুক্ত জেলা—

    কোচবিহার (শুরু)

    জলপাইগুড়ি

    দার্জিলিং

    উত্তর দিনাজপুর

    দক্ষিণ দিনাজপুর

    মালদা

    মুর্শিদাবাদ

    নদিয়া

    হুগলি

    হাওড়া

    উত্তর ২৪ পরগনা (সমাপ্তি)

    এই যাত্রার নেতৃত্বে থাকবেন দলীয় নেতৃত্ব—মহম্মদ সেলিম, সুজন চক্রবর্তী সহ বহু জেলা ও রাজ্যস্তরের নেতা। যদিও এই যাত্রা আপাতত সিপিআই(এম)-এর উদ্যোগে, তবে অন্যান্য বামদল বা কংগ্রেস পরে যোগ দেবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।

    যাত্রার লক্ষ্য ও রাজনৈতিক ভাষ্য

    এই যাত্রাকে শুধু প্রচার নয়, বরং ‘রাজনৈতিক জমির পুনরুদ্ধার এবং মানুষের সঙ্গে সংযোগের লড়াই’ বলছে সিপিআই(এম)। মহম্মদ সেলিম তুফানগঞ্জের উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, “বাংলার পুনর্জাগরণের জন্য বামপন্থার পুনরুত্থান দরকার। এই যাত্রা নতুন বাংলা গড়ার শপথ। প্রথম দাবি—ভোটাধিকার রক্ষা। বিজেপি ও তৃণমূল ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিভাজন ও ভয়ের রাজনীতি চালাচ্ছে, আর আমরা সেই ভয় ভাঙতে পথে নেমেছি।”

    তিনি আরও বলেন, “এই বাংলা আমরা তিল তিল করে গড়েছি। আজ বাংলার শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি সব ভাঙনের মুখে। মমতা বনাম মোদীর রাজনীতি মানুষকে ধর্ম, পরিচয় ও ভয় দিয়ে ভাগ করছে—কিন্তু আমরা মানুষকে একতাবদ্ধ করতে চাই।” সেলিমের বক্তব্যে পুরনো রাজনৈতিক তীর্যক কথাও ছিল— “বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তখন তৃণমূল, বিজেপি, শুভেন্দু, মাওবাদী—সবাই এক হয়েছিল সেই প্রয়াস রুখতে। আজ একই রাজ্য শিল্পহীনতা ও কর্মসংস্থানের সংকটে ভুগছে—এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের নতুন ইতিহাস লেখার সময়।”

    ইস্যু-ভিত্তিক প্রচারের বার্তা

    যাত্রায় উত্থাপিত দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে—

    ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষা

    শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুনর্গঠন

    পরিযায়ী শ্রমিক, গিগ কর্মী, MGNREGA শ্রমিকদের অধিকার

    মাইক্রো-ফাইন্যান্স ঋণ ও বিড়ি শ্রমিকদের সঙ্কট

    নারী নির্যাতন, বেকারত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন

    পরিবেশ, জল-জমি-জঙ্গল রক্ষার দাবি

    সেলিমের কটাক্ষ, “মোদী-মমতা বলছে দেশ এগোচ্ছে, কিন্তু পরিসংখ্যানে প্রসূতি মায়েদের রক্তাল্পতা বাড়ছে। মানুষ ভয় পায় যখন গণতন্ত্র লুঠ হয়, অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।”

    দলীয় লক্ষ্যে স্পষ্টতা—‘যেখানে জয়ের সম্ভাবনা, সেখানে লড়াই’

    দলের এক রাজ্য কমিটি সদস্যের ভাষায়, “আমরা ১১ জেলাকে টার্গেট করেছি কারণ এখানেই আমাদের সংগঠনিক ভরসা আছে। আপাতত কেবল সেই জায়গায় লড়াই যেখানে জেতার সম্ভাবনা তৈরি করা যায়। এবার আর ‘শূন্য’ ফলাফল মেনে নেওয়া হবে না।”

    রাজনৈতিক ভবিষ্যতের আশঙ্কা ও সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণ

    টানা এক দশকের বেশি সময় সংগঠনগত সংকট, জনসংযোগ হারানো, 'শূন্য' হয়ে যাওয়ার পর এই যাত্রা সিপিআই(এম)-এর কাছে শুধু প্রচার নয়—এটি রাজনৈতিক পুনর্জন্মের পরীক্ষা। রাজ্যজুড়ে অপশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, বিজেপির হিন্দুত্বর চেতনার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ এবং বাম সমর্থকদের নীরব-ঐতিহাসিক প্রত্যাশা—সবকিছুর মধ্যে দিয়ে এই যাত্রা রাজনৈতিক পুনর্গঠনের পথ দেখাতে পারে কিনা, সেটাই দেখার।

    রাজনীতি বদলেছে, সমাজ বদলেছে এখন প্রশ্ন— বাম আন্দোলন কি আবার বাংলার মাটি থেকে জেগে উঠবে? আগামী বিধানসভা ভোটই তার উত্তর দেবে।
  • Link to this news (আজকাল)