• নতুন জাতের রসুন চাষে দিশা দেখাচ্ছে হুগলি
    আজকাল | ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • মিল্টন সেন, হুগলি: উৎপাদন বাড়বে। স্বনির্ভরতা আনাতে চলেছে নতুন জাতের রসুন চাষ। হুগলি জেলা উদ্যান পালন দপ্তরের উদ্যোগে বাংলায় রসুনে স্বনির্ভরতা বাড়বে। হুগলির চন্দ্রমুখী আর জ্যোতি আলুর উৎপাদন রাজ্যের মধ্যে অন্যতম। হুগলি জেলায় পেঁয়াজ চাষে অন্যতম ব্লক বলাগড়। এবার রসুন চাষেও দিশা দেখাবে হুগলি। বলাগড়, তারকেশ্বর ও গোঘাটের কয়েকশো বিঘা জমিতে রসুন চাষ হয় আগে থেকেই। দেশি রসুন চাষ হাওয়ায় ফলন কম পান কৃষকরা। সেই কারণেই নাসিকের উন্নত মানের রসুন চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জেলা উদ্যান পালন দপ্তর।

    বাঙালীর খাদ্যাভাসে রসুন নিয়মিত চাহিদাগুলির একটি। বাংলায় রসুন মূলত মহারাষ্ট্র,মধ্যপ্ৰদেশ, গুজরাট থেকে আমদানি করা হয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় পরিবহন খরচের কারণে রসুনের দাম বেড়ে যায়। পিয়াঁজের পাশাপাশি উন্নত মানের রসুনের চাষ বাড়ানো হলে রসুনে স্বনির্ভর হবে রাজ্য। তাতে বাজারে কম দামে রসুন পাবে সাধারণ মানুষ। পনির্ভরতা কমবে। 

    হুগলি জেলায় বলাগরে সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে পিঁয়াজ চাষ হয়। পিঁয়াজ চাষের জন্য বলাগরের মাটি খুবই উর্বর। পিঁয়াজ চাষের সঙ্গে রসুন চাষের সাদৃশ্য থাকায় উপযুক্ত উর্বর মাটি ও আবহাওয়া রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাটের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের মাটি উর্বর। শীতকালীন পেঁয়াজের সঙ্গে রসুন চাষ করলে আবহাওয়া কোন সমস্যা হবে না। 

    পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই নানা পদক্ষেপ করেছে। কৃষকরা, নিজের বাড়িতেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন। তার সঙ্গে রসুন সংরক্ষণও করা যাবে। তিন মাস এই ফসল মজুত রাখতে পারলেই আলুর চেয়েও দাম বেশি পাবেন কৃষকরা। এতে রসুন আমদানিতে অন্য রাজ্যের উপর থেকে নির্ভরতা কমানো যাবে। 

    রাজ্যে যা রসুন চাষ হয় তার পাঁচ গুণ বর্তমানে আমদানি করতে হয় ভিন রাজ্য থেকে। তাই উন্নত রসুন চাষ করলে কৃষক ও রাজ্যের মানুষ লাভবান হবেন। বর্তমানে বলাগরে ১৮০০ বিঘা জমিতে রসুন চাষ হয়। দেশিয় প্রজাতির গঙ্গাজুলি ও কটকি জাতের রসুন চাষ হয়। কিন্তু তার গুনগত মান খুব একটা ভাল নয়। 

    জাতীয় উদ্যান পালন দপ্তরের গবেষকরা তামিলনাড়ুর নাসিকে এই রসুনের জাতের আবিষ্কার করেছিলেন। যা এ রাজ্যে ব্যাপক আকারে চাষ হয়নি। এই রসুনের বীজ আমদানি করে চাষ করলে দ্বিগুন ফলন পাবেন চাষিরা। এক বিঘা জমিতে গঙ্গাজুলির ফলন আট থেকে নয় কুইন্টাল। সে জায়গায় উন্নত জি-২৮২ যমুনা সফেদ থ্রি জাতের রসুন ফলন ২০ থেকে ২২ কুইন্টাল। এখন দেশি রসুনের সঙ্গে ১০ কিলো নতুন রসুন চাষ করানো হচ্ছে উদ্যান পালন দপ্তরের তরফে। ক্লাসটারের মাধ্যমে এই চাষ করার পরিকল্পনা নিয়েছে হুগলি জেলা উদ্যান পালন দপ্তর। ধীরে ধীরে এই বীজ থেকেই চাষ বাড়ানো হলে কৃষকরা লাভবান হবে। রাজ্যে রসুনের চাষে স্বনির্ভর করানোর জন্যই এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। 

    বলাগরের জিরাটে ২২ জন চাষীকে নিয়ে ট্রেনিং দেওয়া শুরু হয়েছে। জিরাটের আরাজি ভবানীপুর ও ভবনীপুর চর মৌজায় রসুন চাষ হয় বহু দিন ধরেই। এই প্রসঙ্গে হুগলি উদ্যানপালন দপ্তরের আধিকারিক শুভদীপ নাথ বলেন, "পশ্চিমবঙ্গ ও আমাদের জেলাতে যথেষ্টই রসুনের ঘাটতি রয়েছে। ভিন রাজ্যের নির্ভরতা কমাতেই রসুন চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন এই রসুন চাষে দ্বিগুন ফলন আনতে পারি আমরা। নাসিকের যে কেন্দ্রের গবেষণা রয়েছে (জি২৪২) যমুনা সফেদ থ্রি এই জাত আমাদের আনানো হয়েছে। সার্টিফাইড বীজ চাষীদেরকে দেওয়া হচ্ছে। চাষিরা কিনে চাষ করছে তাতেও কিছুটা ভর্তুকি দিচ্ছে রাজ্য সরকার। এবারে রসুন কিনে চাষ করলে পরের বছর থেকে সেটাকেই বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন কৃষকরা। চাষও বাড়াতে পারবেন। দেশীয় অনুন্নত যে রসুন বীজ সেটাকেও পরিবর্তন করা যাবে। সেই সঙ্গে ফলনও বেশি পাবে এই নতুন রসুন চাষে।"

    শুভদীপ নাথ আরও বলেন, "গত বছরই রসুন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পাইকারি দামে বিক্রি হয়েছে। সরকারি তরফে কম খরচে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ভর্তুকিও দেওয়া হচ্ছে। আর এখানেই রসুনও সংরক্ষণ করা যাবে। সংরক্ষণের জন্য আর নতুন কোন ব্যবস্থা করতে হবে না। তিন মাস সংরক্ষণ করলেই আড়াইশো টাকা দাম পাবেন কৃষকরা। আমরা ধাপে ধাপে এই নতুন রসুনের চাষ বাড়াব। এবছর এক বিঘা জমিতে কৃষকরা ৬০ কিলো পুরানো রসুন ও  ১০ কিলো নতুন জাত লাগবে। পরের বছর সেই বীজ বৃদ্ধি পাবে। এ বছর ৭৫ বিঘায় উন্নত রসুন চাষ করাচ্ছি। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম হুগলি জেলায় এই বিপুল আকারে চাষ হচ্ছে নাসিকের বিশেষ জাতের রসুনের।"
  • Link to this news (আজকাল)