জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন ডিসেম্বর, শহর কলকাতা যখন বড়দিন আর বর্ষবরণের প্রস্তুতিতে মগ্ন, ঠিক তখনই দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুর কলেজের প্রাঙ্গণে জ্বলে উঠল এক অন্যরকম উৎসবের আলো। নাম তার 'উদ্ভাস'।
গতানুগতিক বার্ষিক অনুষ্ঠানের চিরাচরিত প্রথা ভেঙে ১৭ ও ১৮ই ডিসেম্বর দু'দিন ব্যাপী এই আয়োজনে ফুটে উঠল তরুণ প্রজন্মের মেধা, মৌলিকতা আর সৃজনশীলতার এক অনন্য কোলাজ।
প্রদীপ শিখায় উৎসবের সূচনা
বুধবার সকালে কলেজের ন্যাশনাল ক্যাডেট কর্পস (NCC)-এর রাজকীয় অভিবাদন এবং অধ্যক্ষ ড. জয়দীপ ষড়ঙ্গীর স্বাগত ভাষণের মধ্য দিয়ে এই অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। উদ্বোধনী মঞ্চে চাঁদের হাট বসিয়ে উপস্থিত ছিলেন উচ্চশিক্ষা দপ্তরের ডিপিআই ড. মধুমিতা মান্না, স্থানীয় কাউন্সিলর জুঁই বিশ্বাস, অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্র এবং প্রথিতযশা বাচিক শিল্পী ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়।
অধ্যক্ষের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো কলেজের গৌরবময় অতীতকে সঙ্গী করে ভবিষ্যতের জয়যাত্রার সংকল্প। ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রমুগ্ধ করা আবৃত্তি উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনার নতুন উন্মেষ ঘটায়।
এবারের 'উদ্ভাস'-এর অন্যতম আকর্ষণ ছিল কলেজের পরিকাঠামোয় নতুন সংযোজন। সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের অত্যাধুনিক গবেষণাগার এবং হেরিটেজ স্টাডি সেন্টারের বর্ধিত অংশের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় এদিন। একই সঙ্গে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় উত্তরবঙ্গ চর্চা কেন্দ্রের বিশেষ প্রদর্শনী।
কলেজের ১৭টি বিভাগের প্রায় দু'শতাধিক ছাত্রছাত্রী তাঁদের মৌলিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন বিভিন্ন প্রদর্শনীতে। সেখানে একদিকে যেমন ছিল 'পপুলার ইংলিশ লিটারেচার' বা 'ধ্রুপদী বাংলা ভাষা'র কথা, তেমনই ছিল 'জিওমেট্রি এন্ড প্রবাবিলিটি ইন রিয়াল লাইফ' কিংবা 'ওয়াটার কনজারভেশন'-এর মতো বাস্তবধর্মী বিষয়ের উপস্থাপনা। প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু নিয়ে একটি বিশেষ হ্যান্ডবুকও প্রকাশ করা হয়েছে।
'উদ্ভাস' কেবল নিউ আলিপুর কলেজের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। হেয়ার স্কুল, আশুতোষ কলেজ, বেহালা কলেজসহ কলকাতার প্রায় দশটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই উৎসবকে এক বৃহত্তর রূপ দিয়েছে।
উৎসবের আনন্দের মাঝেও ছাত্রছাত্রীরা ভোলেনি তাঁদের সামাজিক কর্তব্যের কথা। কলেজের জাতীয় সেবা প্রকল্প (NSS)-এর পক্ষ থেকে স্থানীয় শিশুদের হাতে পুষ্টিকর খাবার ও শিক্ষা সামগ্রী তুলে দিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের সমবেত কণ্ঠে রাজ্য সংগীত 'বাংলার মাটি বাংলার জল' পরিবেশন ছিল এক বিশেষ প্রাপ্তি। পাশাপাশি কলেজের নিজস্ব হেরিটেজ স্টাডি সেন্টার ও গ্রন্থাগারের উদ্যোগে তিলোত্তমা কলকাতার ইতিহাস, মৃৎশিল্প এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির ওপর এক দুর্লভ প্রদর্শনী দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতিকেও এই মেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, 'উদ্ভাস' কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মের আত্মপ্রকাশের এক শক্তিশালী মঞ্চ। আগামী দিনের পথ চলায় এই ধরণের আয়োজন ছাত্রছাত্রীদের মেধা ও মনন বিকাশে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে, এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
রিপোর্ট: অয়ন চ্যাটার্জি