• শাহি বৈঠকে ডাক পেলেন দিলীপ, ভোটের মুখে কি গলছে বরফ?
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ০১ জানুয়ারি ২০২৬
  • বুধবার সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের একটি হোটেলে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাংসদ ও বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন অমিত শাহ। সেই বৈঠকে বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি ডাকা হয় দলের একাধিক প্রাক্তন সাংসদকেও। দিলীপ ঘোষ ছাড়াও সেখানে উপস্থিত ছিলেন লকেট চট্টোপাধ্যায়, অর্জুন সিংহ, সুভাষ সরকার, নিশীথ প্রামাণিকরা। তবে গত কয়েক মাসে দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিলেও দিলীপ ঘোষ কার্যত ব্রাত্যই ছিলেন। সেই আবহে শাহের বৈঠকে তাঁর উপস্থিতি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।

    প্রসঙ্গত, গত এপ্রিল মাসে দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দিলীপ ঘোষের সাক্ষাৎ রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন ফেলেছিল। তার পরেই নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে তোপ দেগেছিলেন তিনি। দলের লক্ষ্মণরেখা পেরিয়ে করা সেই মন্তব্যের পর থেকেই রাজ্য বিজেপির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক থেকে শুরু করে রাজ্য বিজেপির শীর্ষ স্তরের কোনও বৈঠকেই তাঁকে ডাকা হয়নি। এমনকি গত ২৫ ডিসেম্বর অটলবিহারী বাজপেয়ীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় গ্রন্থাগারে আয়োজিত রাজ্য বিজেপির আদি নেতাদের সম্মেলনেও দিলীপ ঘোষ ছিলেন ব্রাত্য।

    যদিও বিজেপি সূত্রের দাবি, জাতীয় গ্রন্থাগারের সম্মেলনে তাঁকে একেবারে উপেক্ষা করা হয়নি। প্রায় ৮০০ জনকে ওই সম্মেলনের জন্য ফোন করা হয়েছিল বিজেপির নিজস্ব কলসেন্টার থেকে। দিলীপ ঘোষও সেই তালিকায় ছিলেন। তবে শীর্ষ নেতাদের যেভাবে আলাদা করে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, সেই ফোনটি তিনি পাননি। ফলে তিনি সেখানে যাননি। তার ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় অমিত শাহের বৈঠকে তাঁর উপস্থিতি নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছে। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে খোদ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল ফোন করে দিলীপ ঘোষকে এই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানান।

    দূরত্ব তৈরি হলেও একটি বিষয় লক্ষণীয়— দিলীপ ঘোষের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা কখনও প্রত্যাহার করা হয়নি। শাহের মন্ত্রকের দেওয়া গাড়িও তিনি এখনও ব্যবহার করছেন। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়ে দিলীপ বারবার বলেছেন, ‘দল যা দায়িত্ব দেবে, তা আমি পালন করব।’ ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের মুখে সেই বক্তব্যই যেন বাস্তব রূপ নিতে চলেছে।

    বুধবারের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ঘিরে ধরলেও দিলীপ ঘোষ শাহি বৈঠক নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ। তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বলেন, ‘আমাদের শুধু শুনতে ডাকা হয়েছিল। যা বলার দল বলবে।’ ভবিষ্যতে রাজ্য বিজেপিতে কোনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরেও তিনি ছিলেন যথেষ্ট সতর্ক। জবাবে তিনি এটুকুই বলেন, ‘সেটা দল বুঝবে।’

    এ দিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যে ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটকে পাখির চোখ করেছে, তা শাহের একের পর এক বৈঠকেই স্পষ্ট। সোমবার রাতে কলকাতা সফরে এসে বুধবার সকালে হোটেলে সাংসদ-বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকের পর সায়েন্স সিটি অডিটরিয়ামে কলকাতার নেতাদের নিয়ে আলাদা বৈঠক করেন তিনি। সেখানেই বঙ্গ বিজেপির চার মুখ— শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার ও দিলীপ ঘোষকে নিয়ে পৃথক বৈঠকে বসেন শাহ। উপস্থিত ছিলেন ভূপেন্দ্র যাদব, সুনীল বনসল ও বিপ্লব দেব।

    সূত্রের খবর, এই বৈঠকে শাহ এক এক করে সকলের কথা শোনেন। একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেন, ২০২৬-এর ভোটে টিকিট পেতে গেলে আগামী দু’মাসে যোগ্যতা প্রমাণ করতেই হবে বিধায়কদের। নিজ নিজ এলাকায় কাজ বাড়ানো, সপ্তাহে অন্তত চার দিন এলাকায় থাকা এবং কমপক্ষে পাঁচটি পথসভা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যোগ্যতা পূরণ হলেই মিলবে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ— এই বার্তা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের দাবি।

    বৃহত্তর কলকাতার জন্যও কড়া টার্গেট বেঁধে দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মহানগরের চারটি সাংগঠনিক জেলায় মোট ২৮টি আসনের মধ্যে অন্তত ২০টি আসন জিততেই হবে— এই লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে শাহের বার্তা, ‘তৃণমূলের সঙ্গে কোনও সমঝোতা নেই।’

    বৈঠক শেষে বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা জানান, শাহ স্পষ্ট করে বলেছেন কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনও আপস চলবে না। অনুপ্রবেশ ও দুর্নীতি— এই দুই ইস্যুকেই সামনে রেখে ভোটের লড়াই হবে। ত্রিপুরা ও অসমে সীমান্ত সুরক্ষিত থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে কাঁটাতারের অভাবেই অনুপ্রবেশ বাড়ছে— এই অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।

    সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য বিজেপির আদি-নব্য সংঘাত মেটাতে এবং চার মুখকে এক ছাতার তলায় আনতে খোদ অমিত শাহ যে সক্রিয় হয়েছেন, দিলীপ ঘোষের বৈঠকে এই উপস্থিতি সেই বার্তাই আরও জোরালো করেছে।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)