সমীর মণ্ডল, মেদিনীপুর
অনড় পুটকি। শুনানিতে যাবেন না। কিছুতেই যাবেন না। তাঁর সেই সিদ্ধান্ত থেকে কেউ টলাতে পারেননি মেদিনীপুর ৮০ বছরের বৃদ্ধাকে। পুরো নাম পুটকি হাঁসদা। সাকিন সদর ব্লকের মণিদহ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার শিরিষডাঙা।
প্রায়ই অসুস্থ থাকেন বৃদ্ধা। এই অবস্থায় তাঁকে 'সার' (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। বিএলও (বুথ লেভেল অফিসার)-ও তাঁকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। পারেননি। ২৮ ডিসেম্বর শুনানির কথা ছিল। তিনি যাননি। এমনকী কোনও আবেদনও করতে চাননি।
আদিবাসী এই বৃদ্ধার কথায়, 'ভোটার তালিকায় নাম তুলে আমার কী লাভ? ভোট দিয়ে কী পাই? বার্ধক্য ভাতাটুকুও তো পাই না। আর ক'দিনই বা বাঁচব! এত কষ্ট করে শুনানিতে গিয়ে কী হবে?'
বিএলও, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য যেই বোঝাতে আসছেন, তাঁকেই তিনি একই কথা বলে যাচ্ছেন। বিয়ে করেননি। বাবা-মা বহু বছর আগে মারা গিয়েছেন। পুটকিরা ছিলেন তিন বোন ও চার ভাই। বাবার মৃত্যুর পরে ভাইদের সঙ্গে থাকতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাই-বোনেরাও মারা গিয়েছেন। এখন ভাইপোদের বাড়িতে থাকেন। ২০০২-এর তালিকায় পুটকির নাম নেই। কেন নেই, তা আজ কেউই স্পষ্ট করে বলতে পারেন না।
আত্মীয়রা জানিয়েছেন, তিনি কখনও মেদিনীপুরের পাঁচখুরি এলাকায়, কখনও ডেবরার মাড়তলায়, আবার কখনও শিরিষডাঙায় থাকতেন। স্থায়ী ঠিকানা না থাকার কারণেই হয়তো নাম ওঠেনি ভোটার তালিকায়। পুটকির আধার কার্ডও নেই। তাই বার্ধক্য ভাতাও পান না। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে সম্প্রতি তাঁর কাছে এনিউমারেশন ফর্ম পৌঁছয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিএলএ-২-এর সাহায্যে সেই ফর্ম পুরণ করে জমাও দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর নাম 'নো ম্যাপিং' তালিকায় পড়ে যায়। সে জন্যই শুনানির নোটিস আসে। মণিদহ গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল উপপ্রধান নির্মল মাঝি বলছেন, 'অনেক বুঝিয়েছি। এত দূরে কষ্ট করে যেতে পারবেন না বলছেন। জোর করে তো আর কাউকে নিয়ে যাওয়া যায় না।'
বিএলও বিবেকানন্দ অধিকারীর কথায়, 'বিভিন্ন জায়গায় থাকতেন। ২০০২-এ কোথায় ছিলেন, পরিবারও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। আধার কার্ড নেই। তাই ম্যাপিং-ও করা যায়নি। শুনানির নোটিস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের লোকজনও চান না তিনি শুনানিতে যান।' মেদিনীপুর সদরের বিডিও তথা এইআরও (অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার) কাহেকাশান পারভিন বলেন, 'কোনও বিশেষ কারণে শুনানিতে আসতে না পারলে আবেদন করার সুযোগ আছে। কমিশন তা বিবেচনা করে দেখবে। কিন্তু কেউ যদি নিজেই না আসতে চান, তা হলে আমাদের কিছু করার নেই।'
একই সুর শোনা গিয়েছে মেদিনীপুরের ইআরও (ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার) তথা মহকুমাশাসক মধুমিতা মুখোপাধ্যায়ের গলায়। বলেন, 'শুনানিতে উপস্থিত হতে না পারলে আবেদন করা যায়। কিন্তু কেউ যদি স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি আসবেন না, তা হলে সেটা তাঁর সিদ্ধান্ত। প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনতা আছে।' পুটকির ভাইপো কালীপদ হাঁসদার দাবি, 'পিসির বয়স অনেক। আধার নেই, সরকারি কোনও সুবিধাই পান না। এত বয়সে কষ্ট করে নিয়ে যাওয়ার সাহস পাইনি।'