• এসআইআর আবহে আদালতে হলফনামার লাইনে মানবিক বিপর্যয়
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ০১ জানুয়ারি ২০২৬
  • সূর্য ডোবার পর থেকেই আদালত চত্বরের বাইরে ভিড় জমতে শুরু করছে। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও রয়েছেন সেই দীর্ঘ লাইনে। অপেক্ষারতদের অভিযোগ, প্রতিদিন মাত্র ২০ থেকে ২৫টি করে হলফনামা দেওয়া হচ্ছে। চাহিদা অনেক বেশি হওয়ায় বাধ্য হয়েই আগের দিন থেকে এসে রাত কাটাতে হচ্ছে। অনেকে না খেয়েই দাঁড়িয়ে থাকছেন দীর্ঘ সময় ধরে। নেই বসার জায়গা, পর্যাপ্ত আলো, খাবার জল বা ন্যূনতম পরিকাঠামো।

    নথিতে নাম, জন্মতারিখ বা অন্যান্য তথ্যে সামান্য ভুল থাকলেই দ্রুত সংশোধনের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে হলফনামা। এসআইআর শুনানিতে ডাক পাওয়া বহু মানুষের জন্য এই হলফনামা এখন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা কম থাকায় জমা পড়া আবেদনের তুলনায় প্রতিদিন গড়ে মাত্র কুড়িটির মতো হলফনামা করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষদের মধ্যে ক্রমশ আতঙ্ক বাড়ছে।

    কেতুগ্রামের বাসিন্দা সুষমা ঘোষ বলেন, ‘লাইন পাওয়া যায় না বলে বিকেল থেকেই দাঁড়িয়ে আছি। রাতের অন্ধকারে মশার কামড়ে যত কষ্টই হোক, হলফনামা নিতেই হবে।’ জসিমুদ্দিন আহমেদের কথায়, ‘নথিতে বাবার নামে ভুল থাকায় এসআইআর শুনানিতে ফার্স্ট ক্লাস জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের এভিডেভিট চাওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন মাত্র ২০টি করে এভিডেভিট হওয়ায় বাধ্য হয়ে এই ঠান্ডার রাতে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।’

    কাটোয়া বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক তথা আইনজীবী সৌমেন সরকার জানান, ‘বর্তমানে আদালতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কম থাকার জন্য এভিডেভিট সংক্রান্ত বড় সমস্যা চলছে। প্রয়োজনের তুলনায় সংখ্যা খুবই কম। এসআইআর প্রক্রিয়ায় নথির ভুল সংশোধনের জন্য এভিডেভিট দরকার হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কেন জুডিশিয়াল এভিডেভিট বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নোটারি পাবলিক দিয়ে এভিডেভিট গ্রহণ করা হচ্ছে না কেন, সেই বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশিকা দরকার।’

    এই আবহেই সামনে এসেছে আরও এক মানবিক ছবি। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত ৬২ বছরের গায়ত্রী দাস বাঁ হাত ও বাঁ পা নাড়াতে পারেন না। হাঁটাচলার একমাত্র ভরসা লাঠি। তবু স্ত্রীর নাম খসড়া তালিকায় না থাকায় শুনানিতে হাজির হতে বাধ্য হন স্বামী গৌর দাস। মঙ্গলবার টোটোয় করেই অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে শুনানি কেন্দ্রে পৌঁছন তিনি। খবর পেয়ে বিডিও নীচে নেমে এসে টোটোতেই নথি খতিয়ে দেখেন।

    বিডিও দীপঙ্কর বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের কাছে আগে জানা ছিল না যে, উনি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। জানলে বাড়িতেই শুনানির ব্যবস্থা করা হতো। এদিন যেহেতু এখানে এসেছেন, তাই টোটোতেই শুনানির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।’ যদিও পরিবারের দাবি, অসুস্থতার কথা আগেই জানানো হয়েছিল।

    এসআইআর প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত হলফনামার সংখ্যা বাড়ানো, পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ও মানবিক ব্যবস্থার দাবি উঠছে সর্বত্র।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)